বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

শিরোনাম

ইরানের ভবিষ্যৎ কোন দিকে, গণতান্ত্রিক উত্তরণ নাকি জাতিগত বিভাজনের ঝুঁকি?

রবিবার, জানুয়ারী ১৮, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

ইরানে বছরের পর বছর ধরে চলা অসন্তোষের মাঝে সম্প্রতি ইতিহাসের বৃহত্তম দেশব্যাপী বিক্ষোভের পর এখন এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে। তেহরানের রাজপথগুলোতে এখন আর স্লোগান নেই, বরং সেখানে জেঁকে বসেছে এক অদ্ভুত শূন্যতা।

দেশটির সরকার আগামী মাসে ইসলামী বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি নিলেও ক্ষমতার অলিন্দে এখন উৎসবের বদলে টিকে থাকার লড়াইয়ের উদ্বেগই বেশি স্পষ্ট। যদিও দমন-পীড়নের চিরাচরিত কৌশল ব্যবহার করে বিক্ষোভ সাময়িকভাবে স্তিমিত করা হয়েছে, কিন্তু জনগণের ক্ষোভ এখনো প্রশমিত হয়নি।

২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর থেকে গভীরতর অর্থনৈতিক সংকট এবং সরকারের প্রতি ব্যাপক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে ইরানের একাধিক শহরে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। শুরুতে এই বিক্ষোভের কারণ ছিল লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি, খাদ্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি এবং ইরানি রিয়ালের তীব্র অবমূল্যায়ন। পরে দ্রুতই এটি সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয় যা ১৯৭৯ সালের পর বর্তমান শাসনব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবারের বিক্ষোভে আন্দোলনকারীরা কেবল বর্তমান ব্যবস্থার পতনই চায়নি, বরং নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভির প্রত্যাবর্তনের পক্ষেও স্লোগান দিয়েছে।

ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত বছরের সামরিক সংঘাত এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে ইরান সরকার এবার কোনো ধরনের আপস করার মানসিকতায় ছিল না। ফলে নেমে আসে নজিরবিহীন দমন-পীড়ন। হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, এই বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজারে পৌঁছেছে, যা আধুনিক ইরানের ইতিহাসে এক বীভৎস অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে সামরিক হামলার হুমকি দিলেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতায় আপাতত যুদ্ধের দামামা কিছুটা কমেছে।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল সাময়িক বিরতি। পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরী মোতায়েন এবং পরমাণু কেন্দ্রগুলোর ক্ষয়ক্ষতি ইরানকে আলোচনার টেবিলে অনেকটা দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন এখন কেবল পরমাণু ইস্যু নয়, বরং ইরানের মিসাইল প্রোগ্রাম এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্য সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করতে পারে।

১৯৮৮ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধের শেষে আয়াতুল্লাহ খোমেনি যুদ্ধবিরতিকে ‘বিষপান’ করার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। অস্তিত্ব রক্ষায় বর্তমান নেতৃত্বকেও হয়তো আবারও তেমনই কোনো কঠিন ও তিক্ত সিদ্ধান্তের পথে হাঁটতে হতে পারে।

কিন্তু রাজনৈতিক সমঝোতা হলেও জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তিটি চিরতরে ভেঙে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সাধারণ মানুষ এখন মনে করে, রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা দিতে বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। সংস্কারপন্থি ধারাটি রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ায় পরিবর্তনের আশা এখন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে, বিদেশে অবস্থানরত বিরোধী দলগুলোর মধ্যেও কোনো ঐক্য নেই। রেজা পাহলভিকে ঘিরে কিছু সমর্থন থাকলেও তিনি কতটা কার্যকরভাবে নেতৃত্ব দিতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইরানের এই জাতিগত ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের মধ্যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হলে দেশটি ভেঙে পড়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে এবারের দমনে বিক্ষোভ হয়তো থেমেছে, কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের ইতিহাস বলে, পরিবর্তনের ঢেউ বারবার আছড়ে পড়েই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত পতন নিশ্চিত করে।