কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন মানবসভ্যতার উন্নয়নের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠছে, ঠিক সেই সময়েই এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে চীনের বিরুদ্ধে।
জাপানের প্রভাবশালী দৈনিক ইয়োমিউরি শিম্বুন–এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেইজিং এআই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদেশি নির্বাচনে—বিশেষ করে তাইওয়ানের স্থানীয় ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে—জনমত প্রভাবিত করার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ন্যাশনাল সিকিউরিটি চীনা সরকার–ঘনিষ্ঠ একটি এআই কোম্পানি গোল্যাক্সি (GoLaxy)–এর প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার অভ্যন্তরীণ নথি সংগ্রহ করে।
এসব নথি বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখতে পান, প্রতিষ্ঠানটি হংকং ও তাইওয়ানে অত্যন্ত উন্নত ও সুসংগঠিত এআই–চালিত প্রোপাগান্ডা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বলে দৃশ্যমান আলামত রয়েছে।
ইয়োমিউরি শিম্বুন জানায়, গোল্যাক্সির কার্যক্রম ছিল বহুস্তরবিশিষ্ট। প্রথমে তারা অনলাইন নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সমাজে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে শনাক্ত করত। এরপর এসব ব্যক্তির মানসিক প্রবণতা, মূল্যবোধ, ভাষাভঙ্গি ও এমনকি আঞ্চলিক উপভাষা পর্যন্ত বিশ্লেষণ করা হতো।
এই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তৈরি করা হতো বাস্তব মানুষের মতো আচরণে সক্ষম কৃত্রিম বা কাল্পনিক চরিত্র।
এই এআই–নির্ভর চরিত্রগুলো শুধু একতরফাভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াত না, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনে জড়িয়ে ধীরে ধীরে তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত করার চেষ্টা করত।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কারণে এসব কৃত্রিম চরিত্রকে বাস্তব মানুষের থেকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
তাইওয়ানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের সঙ্গে যুক্ত এক বিশেষজ্ঞ ইয়োমিউরি শিম্বুন–কে বলেন, এআই প্রযুক্তির এই পর্যায়ের উন্নয়ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে এক নতুন ধরনের ‘অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে’ পরিণত করেছে, যেখানে সত্য ও কৃত্রিমতার সীমারেখা ক্রমেই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে গোল্যাক্সি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা কোনো ধরনের বট নেটওয়ার্ক বা মনস্তাত্ত্বিক প্রোফাইলিং তৈরি করেনি এবং হংকং কিংবা অন্য কোনো নির্বাচনের সঙ্গেও তারা যুক্ত ছিল না।
গত আগস্টে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা এ অবস্থান স্পষ্ট করে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রশাসন ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাইওয়ানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই (লাই চিং-তে)–এর পুনর্নির্বাচন ঠেকাতে আগ্রহী। সে লক্ষ্যেই আগামী বছরের ‘নাইন-ইন-ওয়ান’ স্থানীয় নির্বাচন—যাকে সাধারণত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রাজনৈতিক পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হয়—কে কেন্দ্র করে জনমতযুদ্ধ আরও জোরদার হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে গত ১ ডিসেম্বর তাইওয়ানের মেইনল্যান্ড অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের উপদেষ্টা কমিটির এক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বৈঠকে অনলাইনে ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তি মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নাগরিকদের গণমাধ্যম–সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
ইয়োমিউরি শিম্বুন অতীতের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের ঘটনাও তুলে ধরেছে। চলতি বছরের অক্টোবরে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া তিনটি ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিংয়ের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের কাওসিয়ং সিটি মেয়র নির্বাচনের আগে চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) স্ট্র্যাটেজিক সাপোর্ট ফোর্সের ৫৬ নম্বর গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বেইজিংভিত্তিক একটি ডেটা অ্যানালিটিক্স কোম্পানির প্রতিনিধির মধ্যে কথোপকথন হয়েছিল।
ওই অডিওতে শোনা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নির্বাচনকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেন এবং তৎকালীন মেয়র প্রার্থী হান কুও-ইউয়ের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে মন্তব্য করেন। অন্য কণ্ঠে তাইওয়ানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টের বিপুল বৃদ্ধির কথা তুলে ধরে ব্যাপক তথ্যসংগ্রহের সক্ষমতার ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সরাসরি ‘হস্তক্ষেপ’ শব্দটি ব্যবহার না করলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
অডিও রেকর্ডিংগুলোতে আরও উল্লেখ পাওয়া যায় যে ২০১৮ সালের কাওসিয়ং মেয়র নির্বাচন এবং ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য প্রায় দুই কোটি ইউয়ান বরাদ্দ রাখার কথা ভাবা হয়েছিল।
হান কুও-ইউ অপ্রত্যাশিতভাবে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে ঘিরে অনলাইন অনুসন্ধানের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেলে জনমত কারসাজির অভিযোগ আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে আধুনিক যুগে নির্বাচন আর শুধু ব্যালটের লড়াই নয়; এটি তথ্য, প্রযুক্তি ও মনস্তত্ত্বের সম্মিলিত যুদ্ধ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অস্ত্র হয়ে ওঠে, তবে তা শুধু একটি দেশের জন্য নয়—পুরো বৈশ্বিক গণতন্ত্রের জন্যই এক গভীর উদ্বেগের বিষয়।

