মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

শিরোনাম

একে একে নিভছে আশার প্রদীপ

বুধবার, জুলাই ২৩, ২০২৫

প্রিন্ট করুন

একে একে নিভে যাচ্ছে আশার প্রদীপগুলো। প্রাণহীন ছোট্ট দেহগুলো যেন খুব বেশি ভারী হয়ে উঠছে স্বজনের কাঁধে। আাইসিইউর বাইরে সন্তানের সুস্থতা কামনায় থাকা স্বজনের আহাজারি। অন্যদিকে মর্গে কিছু মানুষের প্রতীক্ষা মরদেহ গ্রহণের। আরেক দল এখনও ছুটে বেড়াচ্ছে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে প্রাণপ্রিয় সন্তানের সন্ধানে।

ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩১ জনের মৃত্যুর খবর জান গেছে। নিহতদের মধ্যে ২৫ জনই শিশু। আর আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দেড় শতাধিক। এদিকে নিহতদের দাফনের জন্য জায়গা নির্ধারণ করে দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

মঙ্গলবার দুপুরে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ জনে এবং আহত দেড় শতাধিক। এর মধ্যে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে আহত ৮, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আহত ৪৬, নিহত ১০; ঢাকা মেডিকেলে আহত ৩, নিহত ১; ঢাকা সিএমএইচে আহত ২৮, নিহত ১৬; উত্তরা লুবনা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড কার্ডিয়াক সেন্টারে আহত ১৩, নিহত ২; উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে আহত ৬০, নিহত ১; উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে আহত ১ জন, শহিদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহত ১, ইউনাইটেড হাসপাতালে আহত ২ জন, নিহত ১ এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে আহত ৩ জন।

নিহতদের পরিচয়
নিহতদের মধ্যে ১৮ জনের নাম জানা গেছে। গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ১০ জন ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলো- উত্তরা-১ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা আবুল ফাতাহ মো. ইউসুফের ছেলে শায়ান ইউসুফ (১৪)। তার শরীরের ৯৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। মঙ্গলবার তার চাচা মো. হাবিব সরোয়ার মরদেহ গ্রহণ করেন। তুরাগ থানাধীন তারার টেকের মো. আবু শাহীনের ছেলে রোহান উদ্দিন বাপ্পী (৯)। তার দগ্ধ হয়েছে ৩৫ শতাংশ। একই এলাকার মো. সেলিম মিয়ার ছেলে আরিয়ান-১ (১২)। তার দগ্ধ হয়েছে ৮৫ শতাংশ। রাজবাড়ীর আশরাফুল ইসলামের মেয়ে নাজিয়া (১৩)। তার দগ্ধ হয়েছে ৯০ শতাংশ। ৮৫ শতাংশ হওয়া শিক্ষিকা মাসুকা (৩৭)। দগ্ধ ও মাথায় আঘাত পাওয়া তানভীর (১৪), ৯৫ শতাংশ দগ্ধ হওয়া আফসান ফাইয়াজ (১৪), ১০০ শতাংশ দগ্ধ হওয়া মাহরিন (৪৬), ৬২ শতাংশ দগ্ধ হওয়া জুবায়ের (৩০), শতভাগ দগ্ধ হওয়া এরিকসন (১৩), ৯৫ শতাংশ দগ্ধ হওয়া এবি শামীম (১৪)।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় স্বজনদের কাছে নিহত পাইলক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামসহ ৯টি মরদেহ হস্তান্তরের তথ্য জানিয়েছে আইএসপিআর। তৌকির ইসলাম বাদে অন্যরা হলো- বাগেরহাটের গনি শেখের মেয়ে ফাতেমা আক্তার (৯), বরিশালের সামিউল করিম (৯), কুষ্টিয়ার রজনী ইসলাম (৩৭), টাঙ্গাইলের মেহনাজ আফরিন হুরায়রা (৯), ঢাকার রফিক মোল্লাহর মেয়ে শারিয়া আক্তার (১৩), ঢাকার নুসরাত জাহান আনিকা (১০), মিরপুরের বাসিন্দা মুকুল সালাউদ্দিনের ছেলে সাদ সালাউদ্দিন (৯) এবং গাজীপুরের শাহআলমের মেয়ে সায়মা আক্তার (৯)।

চিকিৎসাধীন ৭৮
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান বলেন, ঢাকার দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে বিমানবাহিনীর জঙ্গি বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ জনে। এর বাইরে গুরুতর আহত ৭৮ জন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

তিনি বলেন, সোমবার যে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, এতে যারা অগ্নিদগ্ধ হয়েছিল, তাদের নিয়ে দুঃখের সঙ্গে আরও খবর শেয়ার করতে চাই। এখানে সোমবার রাতে আরও ৮ জনের মৃত্যুর পরে সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ১০। এখানে ভর্তি আছে ৪২ জন, সিএমএইচে ভর্তি আছে ২৮ জন। সেখানে সর্বমোট মৃতদেহ ছিল ১৫ জনের।

তিনি বলেন, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল থেকে একজন, উত্তরা আধুনিক হাসপাতাল থেকে যাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাকে মৃতদেহ বলছে না, সেটা দেহাবশেষ। সিএমএইচ থেকে ৮ জনের মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে, যিনি পাইলট তার মরদেহটি মর্গে আছে। ৬টি মরদেহ এখনও শনাক্ত করা যায়নি।

বিশেষ সহকারী সায়েদুর আরও জানান, নিহতদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজে। সেখানে বর্তমানে দুজন আইসিইউতে আছে। আর ইউনাইটেড হাসপাতালে একজনকে মৃত অবস্থায় নেওয়া হয়েছিল। মৃত ২৭ জনের মধ্যে ২৫ জন শিশু, ১ জন পাইলট ও ১ জন শিক্ষিকা। তাদের মধ্যে ২০ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বার্ন ইনস্টিটিউট, সিএমএইচসহ বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে ৭৮ জন চিকিৎসাধীন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বার্নে যারা ভর্তি আছে তাদের মধ্য বেশ কয়েকজন আইসিইউতে আছে, আইসিউতে থাকা রোগীদের মধ্যে কয়েকজন ভেন্টিলেটরে আছে। এইচডিইউতে থাকাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আমরা খুবই খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’

সায়েদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সিঙ্গাপুরের হাইকমিশনার সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে আছেন, আমাদের এই হাসপাতালের পরিচালক কেইস সামারি পাঠিয়েছেন, উনারা যদি মনে করেন কাউকে পাঠানোর দরকার, এই বিষয়গুলো উনাদের পরামর্শ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভবনে বিমানবাহিনীর এফটি-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় দগ্ধ ১২ জন বর্তমানে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু শিক্ষার্থী।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, বিমান দুর্ঘটনায় দগ্ধ ১২ জন বর্তমানে ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। এদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। তাদের অবস্থা গুরুতর বলেই আইসিইউতে রাখা হয়েছে।

এদিকে প্রশিক্ষণ বিমানের পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাজশাহী সপুরা কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছে। দাফনের পূর্বে তৌকিরের বাবা তহুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি সেই হতভাগ্য পিতা, যে নিজের সন্তানের মরদেহ কাঁধে নিয়েছি।’ তৌকির ছাড়াও যাদের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে তাদের অশ্রুসজল নয়নে দাফন করা হয়েছে দেশের বিভিন্ন জেলায়।

দাফনের জন্য জায়গা নির্ধারণ
রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতদের দাফনের জন্য জায়গা নির্ধারণ করে দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

মঙ্গলবার দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় নিহতদের কবরস্থ করার জন্য মাইলস্টোন স্কুলের সন্নিকটে উত্তরা ১২ নম্বরের সিটি করপোরেশন কবরস্থানে জায়গা নির্ধারণ করে দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। এই কবরস্থান তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে সংরক্ষণ করা হবে বলেও জানানো হয়েছে প্রেস উইং থেকে।

উল্লেখ্য, গত সোমবার দুপুর ১টা ১৮ মিনিটে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান ঢাকার দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিধ্বস্ত হয়। এতে শতাধিক হতাহতের ঘটনা ঘটে, যার বেশিরভাগই শিশু। এ ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার দেশে রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়।