ডা. টিপু কুমার দাশ
প্রতি বছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব কিডনী দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য- “কিডনী হেলথ ফর অল: কেয়ারিং ফর পিপল অ্যান্ড প্রটেকটিং দ্যা প্ল্যানেট” একটি সময়োপযোগী বার্তা বহন করছে। এই প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কিডনি স্বাস্থ্য কেবল ব্যক্তিগত চিকিৎসার বিষয় নয়; এটি সামাজিক দায়বদ্ধতা, ন্যায্য স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশ সুরক্ষার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই বার্তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাংলাদেশে তিন থেকে চার কোটিরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে ভুগছেন। প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ কিডনি বিকল হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হয় না। কিডনি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও শুরুতে তেমন উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে যখন রোগ ধরা পড়ে, তখন কিডনির কার্যক্ষমতার বড় অংশ ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে যায়।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ কিডনি রোগের প্রধান কারণ। নগরায়ন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং মানসিক চাপ এর কারণে দেশে অসংক্রামক রোগ দ্রুত বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত ব্যথানাশক ওষুধ সেবন, ভেজাল খাদ্য এবং দূষিত পানি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। “প্রটেকটিং দ্যা প্ল্যানেট” অংশটি তাই বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কারণ পরিবেশগত দূষণ সরাসরি কিডনি স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
চিকিৎসা অবকাঠামোও বড় চ্যালেঞ্জ। রাজধানী ও বড় শহরে ডায়ালাইসিস সুবিধা থাকলেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তা সীমিত। সরকারি হাসপাতালে স্বল্প খরচে সেবা মিললেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র। এখানে বিশ্বমানের ডায়ালাইসিস ইউনিট এবং অভিজ্ঞ নেফ্রোলজিস্টদের মাধ্যমে রোগীরা সপ্তাহে দুই-তিনবার ডায়ালাইসিস এবং কিডনি সম্পর্কিত পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন। হাসপাতালটি শহরের বাইরে থেকেও রোগীদের জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করছে, যা দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি দৃষ্টান্ত।
কিডনি প্রতিস্থাপন দেশে সম্ভব হলেও দাতা সংকট ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা প্রক্রিয়া এটিকে সীমিত করে রেখেছে। প্রতিস্থাপনের পর দীর্ঘদিন ওষুধ সেবনের প্রয়োজনীয়তাও ব্যয় বাড়ায়। ফলে অধিকাংশ রোগী শেষ পর্যন্ত ডায়ালাইসিসনির্ভর জীবনযাপনেই সীমাবদ্ধ থাকেন।
বিশ্ব কিডনি দিবস ২০২৬ আমাদের সামনে স্পষ্ট বার্তা তুলে ধরে যে, সবার জন্য কিডনি স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হলে সচেতনতা, প্রাথমিক স্ক্রিনিং, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সাশ্রয়ী চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। সুস্থ মানুষ ও সুস্থ পরিবেশ একে অপরের পরিপূরক। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই নীরব সংকট ভবিষ্যতে আরও গভীর আকার ধারণ করতে পারে।
লেখক
ডা. টিপু কুমার দাশ
এমবিবিএস, এমডি (নেফ্রোলজি)
এটেন্ডিং কনসালটেন্ট, নেফ্রোলজি, এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম

