মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাতের জেরে বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। আগে প্রতিদিন শতাধিক জাহাজ এ পথে চলাচল করলেও এখন তা নেমে এসেছে হাতে গোনা কয়েকটিতে। ফলে শুধু জ্বালানি নয়, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর পড়ছে ব্যাপক চাপ।
তেল ও গ্যাস পরিবহণ ব্যাহত হওয়ায় ইতোমধ্যেই বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। পেট্রোলের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের মতো দেশে গৃহাস্থলির জ্বালানি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে প্রভাব এখানেই থেমে নেই—এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও পণ্যের সরবরাহও হুমকির মুখে।
সারের বাজারে চাপ, খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে
উপসাগরীয় দেশগুলো তেল-গ্যাসভিত্তিক পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য, বিশেষ করে সার উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখে। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া, পটাশ ও ফসফেট এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সংঘাত শুরুর পর এসব পণ্যের রপ্তানি কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্তর গোলার্ধে বপন মৌসুম চলায় এই সময়ে সারের ঘাটতি ফসল উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি অল্প সময়ের বিঘ্নও পুরো মৌসুম নষ্ট করতে পারে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে খাদ্য নিরাপত্তায়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হলে গম, ফল ও সবজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে।
হিলিয়াম সংকটে প্রযুক্তি খাতের দুশ্চিন্তা
বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হিলিয়াম সরবরাহ আসে কাতার থেকে, যা হরমুজ প্রণালি দিয়েই রপ্তানি হয়। এই গ্যাস সেমিকন্ডাক্টর ও মাইক্রোচিপ তৈরিতে অপরিহার্য, যা স্মার্টফোন, গাড়ি ও ইলেকট্রনিক পণ্যে ব্যবহৃত হয়।
সাম্প্রতিক হামলার পর কাতারের বড় উৎপাদন কেন্দ্র রাস লাফান কার্যক্রম বন্ধ করেছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হিলিয়ামের ঘাটতি বাড়লে প্রযুক্তিপণ্য যেমন স্মার্টফোন বা ডেটা সেন্টারের খরচ বাড়ার পাশাপাশি চিকিৎসায় ব্যবহৃত এমআরআই স্ক্যানের ব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে।
ওষুধ শিল্পেও প্রভাবের শঙ্কা
মিথানল ও ইথিলিনের মতো পেট্রোকেমিক্যাল উপাদান ওষুধ তৈরির জন্য অপরিহার্য। উপসাগরীয় দেশগুলো বৈশ্বিক এই উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ন্ত্রণ করে এবং অধিকাংশ রপ্তানি হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে।
এদিকে ভারত, যা বিশ্বের বড় জেনেরিক ওষুধ প্রস্তুতকারক, তাদের পণ্য পরিবহনেও এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। সংঘাতের কারণে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ায় ওষুধের দাম বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
সালফার সংকটে ব্যাটারি ও শিল্পখাত
সালফার, যা তেল ও গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণের উপজাত, এ প্রণালি দিয়ে ব্যাপক হারে পরিবাহিত হয়। এটি সার উৎপাদনের পাশাপাশি ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুত্বপূর্ণ। সালফার থেকে তৈরি সালফিউরিক অ্যাসিড তামা, কোবাল্ট, নিকেল ও লিথিয়াম উত্তোলনে ব্যবহৃত হয়—যেগুলো ব্যাটারি তৈরির মূল উপাদান। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হলে বৈদ্যুতিক যানবাহন, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও সামরিক সরঞ্জামের দামও বাড়তে পারে।
সার্বিক প্রভাব
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা বিশ্ব অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করছে। জ্বালানি থেকে খাদ্য, প্রযুক্তি থেকে স্বাস্থ্য—প্রায় সব খাতেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।

