শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

শিরোনাম

নতুন প্রজন্মের পাথেয় হলো ৩ দিনের মুনা কনভেনশন, হাজারো মুসলিমের মহামিলন

শুক্রবার, আগস্ট ১৫, ২০২৫

প্রিন্ট করুন

ইসলাম শান্তির ধর্ম। মুসলিম-অমুসলিম সবার জন্যই ইসলাম শান্তির বার্তা বহন করে। যুদ্ধসহ বিশ্বব্যাপী চলমান অশান্তি থেকে শান্তির পথে আসতে হলে ইসলামের অনুশাসন মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়া শহরের ঐতিহাসিক ‘পেনসিলভেনিয়া কনভেনশন সেন্টার’-এ অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী মুনা কনভেনশনের বিভিন্ন সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। তারা গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধ ও ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্য সকল মুসলিম রাষ্ট্র ও মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এছাড়া কনভেনশনে বক্তারা অভিভাবকদের নতুন প্রজন্মকে ইসলামের আলোকবর্তিকা হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং ইসলামিক চরিত্র গঠনের মাধ্যমে ইহলৌকিক ও পরকালীন জীবনকে শান্তিময় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বক্তারা বলেন, মুনা কনভেনশন নতুন প্রজন্মের জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। অপরদিকে ইসলাম নিয়ে বিরোধীদের ভুল ধারণা, প্রচার-প্রপাগান্ডা ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সজাগ থাকার পাশাপাশি উত্তর আমেরিকায় বসবাসকারী বাংলাদেশি মুসলিম কমিউনিটির ছেলে-মেয়েদের সচেতন করে তোলার আহ্বান জানানো হয়। কনভেনশনে বিশ্ব মুসলমানদের কল্যাণ কামনা করা হয়। সমাপনী অনুষ্ঠানে শিশুদের বিভিন্ন ইভেন্টে বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদান করা হয়।

ইসলামিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বর্ণাঢ্য আয়োজনে গত ৮, ৯ ও ১০ আগস্ট (শুক্রবার, শনিবার ও রোববার) ‘পেনসিলভেনিয়া কনভেনশন সেন্টার’-এ তিনদিনব্যাপী মুনা কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। ‘Torchbearers of Islam, Spreading the Faith Globally’ স্লোগানে আয়োজিত এবারের মুনা কনভেনশন ২০২৫ রোববার বিকেল ৫টায় আসরের নামাজের মাধ্যমে শেষ হয়। কনভেনশনের উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের মধ্যে ছিল একাধিক সেমিনার, শিশুদের বিভিন্ন রাইড, ইসলামিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বাজার, ইয়ুথ প্রোগ্রাম, সিস্টার্স প্রোগ্রাম ইত্যাদি। কনভেনশন সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় ছিল বিপুল সংখ্যক পোশাক, খাবার, আইসক্রিমসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের স্টল।

কনভেনশনে শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী ও নারীদের জন্য আলাদা অনুষ্ঠান ছিল। তরুণ প্রজন্মের জন্য রোবটিক্স ও এআই বিষয়ক অনুষ্ঠানও ছিলো। এছাড়া তরুণী ও প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষদের জন্য ছিলো বিশেষ সেশন। রোববার ‘মেট্রোমোনিয়াল ডে’-তে অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের জন্য ম্যাচমেকিং পর্ব অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে কলেজপড়ুয়া ও কর্মরত যোগ্য ছেলে-মেয়েরা অংশ নেন। এবারের কনভেনশনে ২০ হাজারেরও বেশি মুসলিম নর-নারী ও শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।

তিনদিনের এই কনভেনশন আমেরিকায় জন্মগ্রহণ ও বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের পাশাপাশি বর্তমান প্রজন্মের জন্যও ছিলো মিলনমেলা। কনভেনশন ঘিরে হাজারো মুসলিমের উপস্থিতিতে ফিলাডেলফিয়া শহর মুখরিত হয়ে ওঠে। কনভেনশন সেন্টার হয়ে ওঠে এক খণ্ড বাংলাদেশ।

মুনা কনভেনশনে ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখেন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় আলেম ড. শায়খ মিজানুর রহমান আজাহারী। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য ও আফ্রিকার বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলাররা আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেশনে বক্তব্য রাখেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ইমাম দেলোয়ার হোসাইন, শেখ আবদুর রহমান খান, আবু সামিহা সিরাজুল ইসলাম, শেখ আবদুস সালাম আজাদী, ড. মহসিন আনসারী, ইমাম সিরাজ ওয়াহহাজ, শেখ মোহাম্মদ এলশিনাভি, ডা. আলতাফ হোসেন, ইমাম রাগাব আবদেলমোনেইন, শেখ মিকাইল আহমেদ, সামী হামদী, মোহাম্মদ ইলসেনওয়ে, ইমাম টম ফ্যাসিন, হামজাহ আব্দুল মালিক, আসিফ হাইরানী, আব্দুল নাসির জাংদা প্রমুখ।

শুক্রবার (৮ আগস্ট) জুমার নামাজ আদায়ের মাধ্যমে কনভেনশনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। জুমার ইমামতি করেন ইমাম সিরাজ ওয়াহহাজ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কোরআন তিলাওয়াত করেন ক্বারি মোহাম্মদ জুনায়েদ হোসেন। বাংলা অধিবেশনে ‘ইসলামী পারিবারিক শিক্ষা ও পরিবার গঠনে স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব ও কর্তব্য’ বিষয়ে আলোচনা করেন ব্যারিস্টার হামিদ হোসাইন আজাদ ও ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার। স্বাগত বক্তব্য রাখেন মুনার ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর আরমান চৌধুরী। প্রথম দিনে ১১টি সেশন অনুষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে ছিল— ইসলামের বিশ্বব্যাপী প্রসার থেকে শিক্ষা, দ্বীনের আলো ছড়ানো, ঐক্য গঠন, সহনশীল মুসলিম যুবক, সিস্টার অনলি এন্টারটেইনমেন্ট সেশন, সংঘাতের ছায়া: মার্কিন ন্যায়বিচারে কাশ্মীরের প্রতিফলন ইত্যাদি।

শনিবার (৯ আগস্ট) সকাল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ২৮টি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। আলোচিত সেশনের মধ্যে ছিল— ইসলামী মূল্যবোধের উন্নয়নে সম্প্রদায়ের ভূমিকা, আমলের পূর্ণতার জন্য বিশুদ্ধ নিয়ত অপরিহার্য, ইসলামের প্রসারে বাংলা অধিবেশন ‘পরিবর্তন চাই? শুরু হোক আমার থেকেই!’, প্রাথমিক মুসলিমদের অবদান, নৈতিক রূপান্তরের পথিকৃৎ মুসলিমরা, শক্তিশালী সম্পর্ক নির্মাণ, মুসলিম নারী নেত্রীর আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্ব ইত্যাদি। এদিন ইয়ুথ সেশনে বিশেষ বক্তব্য রাখেন ক্যাথলিক পরিবারে জন্ম নেয়া পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণকারী আমেরিকান ইমাম টম ফ্যাসিন। রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুনা শিল্পী গোষ্ঠী ও শিশুদের ইসলামিক সঙ্গীত, স্ট্যান্ড-আপ কমেডি ও কবিতা আবৃত্তি পরিবেশন করা হয়।

রোববার (১০ আগস্ট) শেষ দিনে প্রধান সেশনগুলোতে আলোচনা হয় ইসলামের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, বহুসংস্কৃতির সমাজে ইসলামের রূপান্তরমূলক ভূমিকা ও ঐক্যের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার বিষয়ে। এছাড়া শিশুদের পুরস্কার বিতরণী ও অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। সাংস্কৃতিক পর্বে ড. আতাউল ওসমানীর নেতৃত্বে ইসলামিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।

এদিন সকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন মুনার ন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমাম দেলোয়ার হোসাইন ও ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর আরমান চৌধুরী। ইমাম দেলোয়ার হোসাইন বলেন, আমাদের লক্ষ্য আগামী প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং দ্বীনের আলো ছড়িয়ে দেয়া। আমেরিকায় বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মধ্যে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

মুসলিম উম্মাহ অব নর্থ আমেরিকা (মুনা) ১৯৯০ সালে নিউইয়র্কে প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটি ব্যক্তিগত, নৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে কাজ করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যে এর কার্যক্রম বিস্তৃত। মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করা ও ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোই এর মূল লক্ষ্য। এবারের কনভেনশন বাস্তবায়নে ৭ সদস্যবিশিষ্ট নীতি নির্ধারণ কমিটি ও ২১টি সাব-কমিটি কাজ করে।