যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা বৈশ্বিক শুল্ক স্থগিত করার পর, দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ‘টালবাহানা করা’ দেশগুলোর ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত বছর ট্রাম্প আরোপিত বেশিরভাগ শুল্ক বাতিলের সিদ্ধান্ত আসার পর শুল্ক ও বাণিজ্য চুক্তিগুলোর কী হবে—বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তা মূল্যায়ন করছে; এর পরই এই সতর্কবার্তা দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
সোমবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, তারা গ্রীষ্মে সম্পাদিত একটি চুক্তির অনুমোদন স্থগিত করবে। আর চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য পূর্বনির্ধারিত আলোচনা স্থগিত করার কথা জানিয়েছে ভারত।
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে, এই রায় ব্যবহার করে গত বছরের বাণিজ্য প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার বিষয়ে দেশগুলোকে সতর্ক করেছেন ট্রাম্প।
‘যে কোনো দেশ, যারা সুপ্রিম কোর্টের হাস্যকর সিদ্ধান্ত সামনে এনে ‘খেলতে’ চায়, বিশেষ করে যারা বছরের পর বছর ধরে এমনকি দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ছিঁড়ে খেয়েছে’, তাদের ওপর আরও বেশি শুল্ক আরোপ করা হবে, যা সম্প্রতি রাজি হওয়া শুল্কের চেয়েও খারাপ। ক্রেতা সাবধান’, ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন তিনি।
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭৭ সালের আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের অধীনে ট্রাম্প ঘোষিত বৈশ্বিক শুল্ক বাতিল করে। তখন থেকেই এরকম বিশৃঙ্খলার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল।
আদালত বলেন, ওই আইন প্রেসিডেন্টকে এ ধরনের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না। এ শুল্ক মূলত আমদানি পণ্যের ওপর আরোপিত একটি কর, যা দেশে পণ্য আনা ব্যবসায়ীদের পরিশোধ করতে হয়।
আদালতের এমন সিদ্ধান্তের পর, ভিন্ন একটি আইনের অধীনে বিশ্বব্যাপী নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করে প্রতিক্রিয়া জানান ট্রাম্প। পরে তা দ্রুতই ১৫ শতাংশে উন্নীত করেন তিনি। এই ব্যবস্থা, আজ মঙ্গলবার থেকেই কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে ট্রাম্পের প্রাথমিক শুল্ক আরোপের পর যেসব বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে অনেক দেশ এখনও অনিশ্চয়তায় রয়েছে।
সে সময় অনেক দেশ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বা আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা সহজ করাসহ অন্যান্য ছাড়ের বিনিময়ে তাদের পণ্যের ওপর শুল্ক কমাতে চেয়েছিল।
সোমবার যুক্তরাজ্য জানায়, তাদের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তি বহাল থাকবে কি না—এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে। আগের চুক্তিতে শুল্ক হার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা গত শনিবার ট্রাম্প ঘোষিত ১৫ শতাংশ শুল্কের চেয়ে কম।
যুক্তরাজ্যের ব্যবসা ও বাণিজ্য সচিব পিটার কাইল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ঘোষণায় যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা আমি স্বীকার করি।’
তিনি বলেন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও জনগণের স্বার্থ রক্ষায় যুক্তরাজ্য ‘সব ধরনের বিকল্প’ বিবেচনায় রাখছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমিটির চেয়ারম্যান বার্নড ল্যাঞ্জ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে জুলাইয়ে অনুমোদিত চুক্তির বিষয়ে স্পষ্টতা না পাওয়া পর্যন্ত কমিটি তাদের অনুমোদন প্রক্রিয়া স্থগিত রেখেছে।
তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন আগের চেয়েও বেশি অনিশ্চিত।’
যদিও এই রায়ের ফলে বাণিজ্যের প্রতি নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হবে না বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। জোর দিয়ে বলা হয়েছে, শুল্ক আরোপের জন্য এখন অন্যান্য আইনের দিকে ঝুঁকছে তারা।
শুক্রবার ১২২ ধারা প্রয়োগ করেছেন ট্রাম্প, যা আগে কখনো ব্যবহার করা হয়নি। এ আইনের আওতায় কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ১৫০ দিনের জন্য শুল্ক আরোপ করতে পারেন প্রেসিডেন্ট।
এছাড়া তিনি ৩০১ ধারার আওতায় তদন্ত শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন। এটি একটি পৃথক বাণিজ্য আইন, যার মাধ্যমে কোনো দেশের ‘অন্যায্য’ বাণিজ্য চর্চার প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট পাল্টা শুল্ক আরোপ করতে পারেন।
ট্রাম্পের আরোপিত নতুন এই শুল্ক ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং গাড়ির মতো নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর, পূর্ব ঘোষিত শুল্কের পাশাপাশি থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে—যা আদালতের রায়ে প্রভাবিত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার রোববার এবিসি নিউজকে বলেন, ‘আমরা আমাদের পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের নতুন উপায় খুঁজে পেয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি বাস্তবায়নের আইনি পদ্ধতি পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু নীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি।’
রোববার সিবিএস নিউজের সাথে একটি পৃথক সাক্ষাৎকারে গ্রিয়ার বলেন, হোয়াইট হাউস তাদের করা বাণিজ্য চুক্তিগুলো ‘বহাল’ রাখবে। ‘আমরা আশা করি আমাদের অংশীদাররাও পাশে থাকবে,’ বলেন তিনি।
সোমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শেয়ারের দাম প্রায় এক শতাংশ কমেছে, যা বাণিজ্য অনিশ্চয়তার কারণে কিছুটা চাপের মধ্যে রয়েছে। এটি অব্যাহত থাকবে বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
নতুন ১৫ শতাংশ শুল্ক ১৫০ দিন পরে শেষ হওয়ার কথা, যদি না কংগ্রেস তাদের মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে ভোট দেয়।
এদিকে, সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার সোমবার সতর্ক করে বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা শুল্ক বাড়ানোর যেকোনো প্রচেষ্টায় বাধা দেবে। এছাড়া ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক কিছু রিপাবলিকানের কাছেও অপ্রিয়।
শুমার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞকে আরও এগিয়ে নিতে রাজি হবেন না।’
অন্যদিকে, সোমবার সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, শুল্কের জন্য তার কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই।

