বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

শিরোনাম

চবির আওয়ামীপন্থী শিক্ষক আবু নোমানের দাপট চলমান, বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ

রবিবার, নভেম্বর ৯, ২০২৫

প্রিন্ট করুন

স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আমলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সবচেয়ে দাপুটে শিক্ষক নেতা ছিলেন আইন বিভাগের অধ্যাপক আবু নোমান। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্ষদে নিবার্চন করে ক্ষমতার মসনদ আকঁড়ে রেখেছিলেন তিনি। আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের পক্ষে নির্বাচন করে বর্তমান শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকও তিনি। স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের আমলে যেমন দাপুটে ছিলেন সরকার পতনের পরেও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে দাপুটে ভূমিকা রাখছেন। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।

জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন অধ্যাপক নোমান। স্বৈরাচার হাসিনা সরকার পতনের এক দফা দাবিতে যখন শিক্ষার্থীরা রাজপথে জীবন দিচ্ছে তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ‘মৌন মিছিল’ করে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরা। সেই মিছিলের প্রথম সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এই শিক্ষক।

অভিযোগ আছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে গড়ে তুলেন নিজস্ব বলয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে রয়েছে আলাদা কোরাম। তার বিরুদ্ধে কেউ আঙ্গুল তুললেই লেলিয়ে দিতেন ওইসব শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। এ ক্ষমতা বলে আওয়ামী লীগের আমলে দুইবার আইন অনুষদের ডিন, বিভাগের সভাপতি, বিভাগের চেয়ারম্যান, সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন হলুদ দলের ‘স্টিয়ারিং কমিটি’র প্রভাবশালী সদস্য নির্বাচিত হন।

অভিযোগ আছে, আইন বিভাগের চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ দিনে তিনি বিভাগের ব্যাংক একাউন্ট থেকে ৪ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা উত্তোলন করেন। এছাড়া বিভাগকে এখনো ১৭ লাখ টাকার হিসেব বুঝিয়ে দিতে পারেননি আবু নোমান। চেয়ারম্যানের শেষ কর্মদিবসে বিভাগের অন্য শিক্ষকরা ১৭ লাখ টাকার হিসেব চাইলে তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, আমি কি চোর, আমি কোন পরিবারের ছেলে জানান! পরে সব হিসেব বুঝিয়ে দিবো বলে বৈঠক থেকে উঠে যান। আইন অনুষদে ডিনের দয়িত্ব পালন করেছেন ৫ বছর। এ ৫ বছরের আয়-ব্যয়ের হিসেবও এখানো দিতে পারেননি অধ্যাপক আবু নোমান।

সূত্র বলছে, বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও ফেনী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের কো-অডিনেটর (ডিন সমমান) হিসেবে স্বৈরাচার আমল থেকে এখনো পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এ দুই প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি মাসে লাখের ওপরে সম্মানী গ্রহণ করেন। আওয়ামী সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোন ধরনের অনুমতি ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বাহিরের বিশ্ববিদ্যালয় ২টিতে তিনি এসব দায়িত্ব পালন করছেন।

এছাড়া তিনি চট্টগ্রামের প্রায় সব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের কোর্স নিয়েছেন। নিয়মানুযায়ী একজন শিক্ষক তার নিজস্ব বিভাগের ক্লাস-পরীক্ষার যথাযথ দায়িত্ব পালন করার পর অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ দুটি কোর্স পড়াতে পারেন। সেখান থেকে আয়কৃত টাকার ১০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগারে জমা দিতে হয়। এছাড়া চট্টগ্রাম জেলার বাইরে ক্লাস নেওয়ার বা দায়িত্ব পালন করা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কিন্তু আইন বিভাগের অধ্যাপক আবু নোমান এসব আইন মানছেন না বলে অভিযোগ আছে।

স্বৈরাচার সরকারের পতনের পরেও যখন আবু নোমান বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ডিনের দায়িত্ব পালন করতে যান যখন শিক্ষার্থীরা তাকে স্বৈরাচারের দোসর আখ্যা দিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলেন। পরে বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে সেই পদ থেকে সরিয়ে নেয়। সেই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

অভিযোগ আছে, তিনি আইন অনুষদের একমাত্র একাডেমিক জার্নল “The Chittagong University Journal of Law ” এর কেবলমাত্র একটি সংখ্যা প্রকাশ করেন। যেখানে প্রতিবছর ১টি করে সংখ্যা প্রকাশ করার কথা ছিল। সহকর্মীদের চাপের মুখে আরও একটি সংখ্যা প্রকাশ করবেন বলে দেড় লক্ষ টাকা তুলে নিয়ে যান এবং ২ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও উক্ত জার্নাল প্রকাশ করেননি।পরবর্তীতে জুলাই বিপ্লবের পর বিষয়টি নিয়ে কথা বললে ও ফেসবুকে লেখালেখি হলে তিনি তড়িঘড়ি করে উক্ত জর্নাল প্রকাশ করেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রফেসর আবু নোমান ডিন থাকাকালীন আইন বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের সদস্য হয়ে আইন বিভাগের প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন গুরুতর ব্যার্তয় ঘটিয়েছেন। তখন আইন বিভাগের প্ল্যানিং কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত প্রভাষক পদের বিপরীতে তিনি ৪ জন প্রভাষক নিয়োগ করেন। যেখানে অনেক পেছনের সারি প্রার্থী প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিল।

নিয়োগ পাওয়া প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। সাবেক উপচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দীন চৌধুরীর ডান হাত হিসেবে পরিচিত ছিলেন অধ্যাপক আবু নোমান। কর্মচারী নিয়োগ বোর্ড থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে দূনীর্তির মাধ্যমে প্রচুর অর্থের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে অধ্যাপক আবু নোমান।

জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগের অর্থযোগান দাতা ও সরাসরি স্বৈরাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত এসব শিক্ষক কিভাবে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যদে ভুমিকা রাখেন এমন প্রশ্নের জবাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার বলেন, আমরা তাদের তালিকা করেছি, সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিচ্ছি।