শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬

শিরোনাম

লেবাননেও গাজা পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে ইসরাইল?

শনিবার, মার্চ ১৪, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

লেবানন সীমান্তে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সাম্প্রতিক তৎপরতা এবং এর ভয়াবহ মানবিক প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহলে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় প্রয়োগ করা ইসরাইলি সমরকৌশল বা ‘ডকট্রিন’ এখন লেবাননেও অনুসৃত হচ্ছে, যার মূল স্তম্ভ হলো—ব্যাপকহারে বেসামরিক জনগণকে উচ্ছেদ করা, অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে ভেঙে ফেলা।

গত দুই সপ্তাহের কম সময়ে লেবাননে প্রায় ৬০০ জন নিহত হয়েছেন এবং ৭ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন।

এই কৌশলের অধীনে প্রথমে নির্দিষ্ট এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় অথবা জীবনধারণের উপায়গুলো ধ্বংস করে মানুষকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। পরবর্তীতে বেসামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে তথাকথিত ‘বাফার জোন’ বা নিরাপত্তা বলয় তৈরির মাধ্যমে ভূখণ্ড সম্প্রসারণের চেষ্টা চালানো হয়।

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও গাজায় দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োগ করা এই নীতি এখন বৈরুত ও দক্ষিণ লেবাননে কার্যকর হতে দেখা যাচ্ছে। গাজায় যেমন পুরো উত্তর অংশ থেকে বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে এলাকাটিকে জনশূন্য করার চেষ্টা করা হয়েছিল, লেবাননের ক্ষেত্রেও একই ধরণের মানচিত্র ও উচ্ছেদ প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে।

ঐতিহাসিকভাবে আশির দশকে লেবাননে ইসরাইলের লক্ষ্য ছিল একটি অনুগত সরকার গঠন করা। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। গাজার অভিজ্ঞতা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসরাইল এখন কোনো নির্দিষ্ট সরকার গঠনের চেয়ে বরং একটি ভূখণ্ডকে প্রশাসনিকভাবে পঙ্গু ও বিচ্ছিন্ন করে দিতেই বেশি আগ্রহী।

ইসরাইল ইতোমধ্যে দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল খালি করার নির্দেশ জারি করেছে। স্কুলগুলো এখন আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এবং স্বাস্থ্যকর্মীরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। এমনকি সমুদ্রতীরবর্তী তাঁবুতেও বোমা হামলার খবর পাওয়া গেছে। লেবানন সরকারকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করতে দেশটির রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে হামলার হুমকিও দিয়েছে ইসরাইল।

তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, লেবানন ও গাজার পরিস্থিতি এক নয়। গাজায় হামাস একটি অবরুদ্ধ ভূখণ্ডে সীমিত রসদ নিয়ে লড়াই করলেও হিজবুল্লাহর কাছে রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার, সুসংগঠিত অবকাঠামো এবং দীর্ঘ কয়েক দশকের যুদ্ধের প্রস্তুতি। ফলে দক্ষিণ লেবানন ও বেকা উপত্যকায় ইসরাইলি স্থল অভিযান ইতোমধ্যে শক্তিশালী প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে ইরানও লেবাননের ভাগ্যকে যে কোনো যুদ্ধবিরতি আলোচনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করে ফ্রন্টগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার ইঙ্গিত দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মহলে এই সমরকৌশল নিয়ে সমালোচনা থাকলেও কার্যকর কোনো জবাবদিহিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক আদালত বা নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে আসা পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

সমালোচকদের মতে, আন্তর্জাতিক আইনের ক্রমাগত লঙ্ঘনের মাধ্যমেই একে একটি ‘স্বাভাবিক’ ঘটনায় পরিণত করার চেষ্টা চলছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রকাশ্য বা পরোক্ষ সমর্থন, অন্যদিকে আরব অঞ্চলের কিছু শক্তির কৌশলগত অবস্থান এই ডকট্রিনকে আরও শক্তিশালী করছে। এ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা ফেরাতে আন্তর্জাতিক আইনের নিঃশর্ত প্রয়োগ এবং বাস্তুচ্যুতদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের অধিকার নিশ্চিত করাকে একমাত্র পথ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।