মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) লেনদেন শেষে ব্যারেলপ্রতি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দাঁড়িয়েছে ১০৩ দশমিক ১৪ ডলার, যা ২০২২ সালের আগস্টের পর প্রথমবারের মতো ১০০ ডলার অতিক্রম করল।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শেয়ারবাজার ও মুদ্রাবাজারেও।
তথ্যমতে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একদিনে ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের ফিউচারস ৩ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ৭১ ডলারে বন্ধ হয়েছে।
এ দাম বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে। তিনি বলেছেন, আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘খুব কঠোর’ পদক্ষেপ নিতে পারে। একই সময়ে বৈশ্বিক সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে রুশ তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল করার কথাও বলা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে উদ্বেগ
সংঘাত আরও তীব্র হয় যখন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। বিশ্বে উৎপাদিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
ফেডারেটেড হারমিসের ফিক্সড ইনকাম বিভাগের প্রধান মিচ রেজনিক বলেন, বাজারে দ্রুতগতিতে নানা খবর আসছে, যা তেলের দাম এবং আর্থিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
শেয়ারবাজার ও ডলারের প্রতিক্রিয়া
অনিশ্চয়তার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি প্রধান শেয়ার সূচকই দিন শেষে নিম্নমুখী ছিল। ডাও জোন্স সূচক ০.২৫ শতাংশ, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং নাসডাক কম্পোজিট ০ দশমিক ৯ শতাংশ কমে যায়।
ইউরোপের শেয়ারবাজারও একই ধারা অনুসরণ করেছে। ইউরোপের স্টক্স ৬০০ সূচক ০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং এমএসসিআইয়ের বৈশ্বিক শেয়ার সূচক ০ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। ফলে ডলারের মান অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় প্রায় ০ দশমিক ৮ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছে।
মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ছে
তেলের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদ কমানোর সম্ভাবনা আগের তুলনায় কমে গেছে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা।
আগে যেখানে সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোর আশা করা হচ্ছিল, এখন তা কমে প্রায় ২০ বেসিস পয়েন্টে নেমে এসেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দুই বছরের ট্রেজারি বন্ডের ফলন ছয় মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমানো হয়েছে, কারণ ভোক্তা ব্যয় ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল।
মুদ্রাবাজারে ইউরোর দাম ০ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ১ দশমিক ১৪১৭ ডলারে নেমে এসেছে। জাপানি ইয়েনও দুর্বল হয়ে ডলারের বিপরীতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর সর্বনিম্ন ১৫৯ দশমিক ৬৬-এ নেমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের শক্ত অবস্থানের কারণে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বাজারে হস্তক্ষেপ করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
এদিকে সোনার দামও ১ দশমিক ২৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৫,০১৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে, কারণ অনেক বিনিয়োগকারী এখন তেল ও ডলারের দিকেই ঝুঁকছেন।

