ইরানের সঙ্গে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছানোর উপক্রম হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই বিশ্লেষকরা দাম ১০০ ডলার ছাড়ানোর পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের তিন সপ্তাহের মাথায় বাজার পর্যবেক্ষণকারীরা এখন প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১৫০ থেকে এমনকি ২০০ ডলার হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখছেন।
চলতি বছরের ৯ মার্চ বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ১২০ ডলারে উঠে যায় এবং ১৩ মার্চের পর থেকে তা আর ১০০ ডলারের নিচে নামেনি। বুধবার (১৮ মার্চ) ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাস ফিল্ডে ইসরাইলি হামলা এবং এর জবাবে কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি স্থাপনায় ইরানের পাল্টা আক্রমণ তেলের দামকে আরও উসকে দিয়েছে।
বর্তমানে ওমান ও দুবাইয়ের মতো মধ্যপ্রাচ্যের বেঞ্চমার্ক তেলগুলো ইতোমধ্যে ১৫০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে, যা ব্রেন্ট ক্রুডের জন্য ২০০ ডলারে পৌঁছানোর পথ প্রশস্ত করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বৈশ্বিক তেলের সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের শুরুতে ইরান এই প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিলে সেখানে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নৌপথ সচল করতে আন্তর্জাতিক নৌ-বহর তৈরির চেষ্টা করলেও তাতে আশানুরূপ সাড়া পাননি। বর্তমানে কেবল ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক ও চীনের পতাকাবাহী হাতেগোনা কিছু জাহাজকে যাতায়াতের অনুমতি দিচ্ছে ইরান। আইইএ-এর সমন্বয়ে বিভিন্ন দেশ তাদের জরুরি মজুদ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, বাজার বিশ্লেষকদের মতে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
তেলের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে তা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মানেই বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যাওয়া। ২০০৮ সালের বিশ্ব মন্দার সময় তেলের দাম সর্বোচ্চ ১৪৭.৫০ ডলারে উঠেছিল, যা আজকের মুদ্রাস্ফীতি অনুযায়ী প্রায় ২২৪ ডলারের সমান।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০০ ডলারের তেল বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি ‘বড় ব্রেক’ বা প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে, যা কেবল জ্বালানি নয় বরং সার ও প্লাস্টিকের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যেরও তীব্র সংকট তৈরি করবে। তবে কিছু বিশ্লেষক আশা করছেন যে, উচ্চমূল্যের কারণে তেলের চাহিদা কমে এলে এবং আমেরিকা বা কানাডার মতো দেশগুলো উৎপাদন বাড়ালে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।

