ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাস ফিল্ডে ইসরাইলি বিমান হামলা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধকে এক বিপজ্জনক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সিএনএন-এর ভূ-স্থানিক বিশ্লেষণ এবং ভিডিও চিত্রে বুধবারের (১৮ মার্চ) এই হামলার ধ্বংসযজ্ঞ নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই আক্রমণ কেবল যুদ্ধের মোড়ই ঘুরিয়ে দেয়নি, বরং ইরানকে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হানতে প্ররোচিত করেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ পার্স ফিল্ডটি সম্পূর্ণ ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ পার্স হলো বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস ভাণ্ডারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা পারস্য উপসাগরের জলসীমায় অবস্থিত। ইরান ও কাতার যৌথভাবে এই বিশাল গ্যাস ক্ষেত্রের মালিক, যেখানে কাতারের অংশটি ‘নর্থ ডোম’ নামে পরিচিত।
রয়টার্সের জানায়, এই পুরো ক্ষেত্রে প্রায় ১৮০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট ব্যবহারযোগ্য গ্যাস রয়েছে, যা দিয়ে পুরো বিশ্বের আগামী ১৩ বছরের জ্বালানি চাহিদা মেটানো সম্ভব। ইরানের জন্য দক্ষিণ পার্স কেবল একটি গ্যাস ক্ষেত্র নয়, বরং এটি তাদের অভ্যন্তরীণ শক্তির প্রধান উৎস। এখান থেকে উত্তোলিত গ্যাস দিয়ে ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ঘরবাড়ি গরম রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ফলে এই অবকাঠামোতে আঘাত হানা মানে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সরাসরি অচল করে দেওয়া।
এই হামলার গুরুত্ব আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাতার তাদের অংশের উন্নয়নে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং বর্তমানে দেশটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহকারী। কাতার থেকে সরবরাহকৃত এই গ্যাস যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় জ্বালানি উৎস।
সংযুক্ত আরব আমিরাত এই হামলাকে সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে অভিহিত করে একে ‘মারাত্মক উস্কানি’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। অন্যদিকে কাতার একে একটি ‘বিপজ্জনক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ইসরাইলি হামলার জবাবে ইরান কাতারের প্রধান জ্বালানি কেন্দ্র রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি এবং সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের দুটি শোধনাগারে আক্রমণ চালায়। এতে কাতারের গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরবও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রাখে বলে ঘোষণা দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্ব যখন এমনিতেই জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে, তখন এই হামলা বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি অবকাঠামোর এই ক্ষতি মেরামত করতে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদী সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইসরাইলি হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কিছুই জানত না। তবে সিএনএন-এর হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, দুইজন ইসরাইলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমন্বয় করেই চালানো হয়েছে।
ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে কাতার পুনরায় আক্রান্ত হলে তিনি ইরানের পুরো গ্যাস ফিল্ডটি ধ্বংস করে দেবেন। সব মিলিয়ে দক্ষিণ পার্স গ্যাস ফিল্ডকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন একটি বৈশ্বিক জ্বালানি ও নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিয়েছে।

