শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬

শিরোনাম

তেলআবিবের আকাশে হাজার হাজার কাক, যে কারণে আতঙ্কে ইসরাইলিরা

বৃহস্পতিবার, মার্চ ২৬, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

ইসরাইলের বাণিজ্যিক রাজধানী তেলআবিবের আকাশ হঠাৎ করেই এক অপার্থিব ও ভয়ার্ত রূপ ধারণ করেছে। গত মঙ্গলবার শহরের আকাশ উড়তে দেখা যায় হাজার হাজার কালো কাক। বিশাল এই পাখির ঝাঁক যখন দিগন্তজোড়া আকাশ ঢেকে দিচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল যেন কোনো এক অদৃশ্য কালো চাদরে ঢেকে যাচ্ছে পুরো শহর। বিশেষ করে বিখ্যাত আজরিয়েলি টাওয়ারের মতো সুউচ্চ ভবনগুলোর ওপর দিয়ে যখন এই পাখির দল অন্তহীন চক্রাকারে উড়ছিল, তখন সেই দৃশ্য দেখে আঁতকে ওঠেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ভাইরাল হওয়া এই ভিডিও এখন বিশ্বজুড়ে তৈরি করেছে তীব্র কৌতূহল ও আতঙ্ক।

ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে যখন যুদ্ধ পরিস্থিতি চরমে, ঠিক সেই মুহূর্তে তেলআবিবের আকাশে এমন অস্বাভাবিক দৃশ্যকে অনেকেই ‘অশুভ লক্ষণ’ বা ‘প্রলয়ের সংকেত’ হিসেবে দেখছেন। নেটিজেনদের একাংশ মনে করছেন, এটি কোনো আসন্ন বড় বিপর্যয়েরই ইঙ্গিত। এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারী লিখেছেন, ইতিহাস বলে বড় কোনো বিপর্যয়ের ঠিক আগেই প্রকৃতি এভাবে সংকেত দেয়।

শুধু সাধারণ মানুষই নয়, ধর্মীয় তাত্ত্বিকরাও এই ঘটনার ব্যাখ্যা খুঁজছেন প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে। অনেকেই বাইবেলের ‘বুক অব রেভেলেশন’-এর ১৯:১৭ নম্বর আয়াতের কথা টেনে এনেছেন। সেখানে বর্ণনা করা হয়েছে যে, কোনো এক মহাপ্লাবন বা বিশাল যুদ্ধের আগে এভাবেই আকাশের পাখিরা কোনো এক বিশেষ স্থানে জড়ো হবে।

ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেলআবিবের এই ‘চলন্ত কালো মেঘ’ অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষের মনেই ভয়ের উদ্রেক করেছে।

পাখিদের এই অদ্ভুত আচরণ নিয়ে মানুষের ভীতি নতুন কিছু নয়। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, প্রাচীন রোমানরা পাখিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার জন্য আলাদা একদল পুরোহিত নিয়োগ দিত, যাদের বলা হতো ‘অগার’। এই পুরোহিতরা পাখির ওড়াউড়ি বা ডাক শুনে নির্ধারণ করতেন রাষ্ট্র কোনো যুদ্ধে যাবে কিনা কিংবা নতুন কোনো নেতা নির্বাচিত হবে কিনা।

একইভাবে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে টাওয়ার অব লন্ডনের দাঁড়কাকদের গল্প। প্রচলিত আছে, যদি কোনোদিন এই টাওয়ার থেকে দাঁড়কাকগুলো চলে যায়, তবে পতন ঘটবে ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের। এই প্রাচীন বিশ্বাস এতটাই বদ্ধমূল যে, আজও সেখানে কমপক্ষে ছয়টি দাঁড়কাককে রাষ্ট্রীয়ভাবে লালন-পালন করা হয়। তেলআবিবের ঘটনার পর এই ধরনের প্রাচীন লোকগাথাগুলো আবার নতুন করে আলোচনায় উঠে আসছে।

তবে সাধারণ মানুষের মনে অলৌকিক বা অশুভ ভীতি কাজ করলেও পাখি বিশেষজ্ঞরা একে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং রুটিনমাফিক ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। পক্ষীবিদদের মতে, ইসরাইল বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ‘বার্ড ফ্লাইওয়ে’ বা পাখির পরিযায়ন রুট। প্রতি বছর বসন্তকালে প্রায় ৫০ কোটি পাখি এই আকাশপথ ব্যবহার করে উত্তর থেকে দক্ষিণে পাড়ি জমায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরাইলে ‘হুডেড ক্রো’ বা এক বিশেষ প্রজাতির হুদুদ কাক খুবই সাধারণ। মার্চ মাসে এদের প্রজনন ও বাসা তৈরির সময় হওয়ায় এরা দলবদ্ধভাবে বিচরণ করে। শহর এলাকায় খাবারের সহজলভ্যতা এবং সুউচ্চ দালানগুলোর আশ্রয়ে পাখিরা প্রায়ই এভাবে বড় ঝাঁক তৈরি করে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এটি কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনা নয়, বরং ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে পাখিদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি সাধারণ প্রক্রিয়া। পরিবেশগত কোনো বিপর্যয় বা হঠাৎ কোনো শব্দের কারণেও পাখিরা এভাবে আতঙ্কিত হয়ে আকাশে উড়তে পারে।

বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা দিলেও সাধারণ মানুষের মন থেকে ভয় দূর হচ্ছে না। এর পেছনে কাজ করছে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্যে যখন যুদ্ধের দামামা বাজছে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের ১০০০-এরও বেশি সেনা মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছেন। ইরান ও ইসরাইলের পালটাপালটি হামলায় ইতোমধ্যে ২০০০-এর বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণেই মানুষ আকাশের সাধারণ পাখির ঝাঁককে ‘রণডঙ্কা’ হিসেবে কল্পনা করছে।