মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

শিরোনাম

যুগে যুগে নৌ-অবরোধ আসলে কতটা কার্যকর হয়েছে?

মঙ্গলবার, এপ্রিল ২১, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

ওমান উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জাহাজে ইরান ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি। এর আগে মার্কিন নৌবাহিনী ‘তোস্কা’ নামের একটি ইরানি পতাকাবাহী কন্টেইনার জাহাজ জব্দ করে। এরপরই এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানানো হয়।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ছয় ঘণ্টা ধরে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়ার পরও কোনো সাড়া না পাওয়ায় ইউএসএস স্প্রুয়েন্স জাহাজটি ‘তোস্কা’র প্রপালশন বা চালিকাশক্তি অচল করে দেয়।

পরবর্তীতে ইউএসএস ত্রিপোলি যুদ্ধজাহাজ থেকে হেলিকপ্টারে করে মার্কিন সেনারা দড়ি বেয়ে জাহাজটিতে ওঠে।

জাহাজটির অটোমেটিক আইডেনটিফিকেশন সিস্টেম অনুযায়ী, এটি ১২ এপ্রিল মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্লাং থেকে যাত্রা শুরু করে এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের চাবাহার বন্দরের কাছাকাছি প্রায় ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ-অবরোধ অমান্য করার চেষ্টা করায় জাহাজটিকে ‘যথাযথ সতর্কবার্তা’ দেওয়া হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, ‘ইরানি নাবিকরা কথা শুনতে অস্বীকার করেছিল, তাই আমাদের নৌবাহিনী তাদের ইঞ্জিন রুমে আঘাত করে জাহাজটি মাঝপথে থামিয়ে দেয়।’

২৯০ মিটার দীর্ঘ এই ইরানি জাহাজটি বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। জাহাজটি আগে থেকেই মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল এবং বর্তমানে এতে কী আছে তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।

নৌ-অবরোধ: যুদ্ধের পুরনো কৌশল নতুন করে আলোচনায়

নৌ-অবরোধ বা সামুদ্রিক অবরোধ হলো এমন একটি কৌশল, যেখানে সমুদ্রপথ বন্ধ করে কোনো দেশের অর্থনীতি দুর্বল করা, বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করা এবং প্রতিপক্ষকে চাপের মুখে ফেলা হয়।

ইতিহাসে দেখা যায়, এই কৌশল অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও এর ফলাফল সবসময় জটিল ও বহুমাত্রিক।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: জার্মানির ওপর ব্রিটিশ অবরোধ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪–১৯১৮) চলাকালে জার্মানির ওপর ব্রিটেনের নৌ-অবরোধ ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। ব্রিটিশ রয়েল নেভি উত্তর সাগরে আধিপত্য ব্যবহার করে জার্মানির বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। ধীরে ধীরে খাদ্য ও সারও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসে।

যুদ্ধ দীর্ঘ হলে আমদানি কমে যায়, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়।

১৯১৬ সালে খাদ্য সংকট ভয়াবহ রূপ নেয়, যা ‘টার্নিপ উইন্টার’ নামে পরিচিত। ঐ সময় অপুষ্টি ও রোগে বহু বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয় বলে ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: জাপানের ওপর মিত্রশক্তির অবরোধ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

১৯৪৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিনগুলো জাপানি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। পরে ‘অপারেশন স্টারভেশন’ নামের মাইন অভিযান জাপানের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো অচল করে দেয়।

ফলে জাপানের বাণিজ্যিক জাহাজ বহর প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়, যা যুদ্ধ অর্থনীতিকে ভেঙে দেয়।

১৯৬২: কিউবা সংকটে ‘নৌ-কোয়ারেন্টাইন’

কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ‘অবরোধ’ শব্দ ব্যবহার না করে ‘কোয়ারেন্টাইন’ শব্দ ব্যবহার করে। এর উদ্দেশ্য ছিল কিউবায় সোভিয়েত অস্ত্র পৌঁছানো বন্ধ করা। অভিযানটি সীমিত ছিল এবং এক মাসেরও কম সময় স্থায়ী হয়।

শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান হয়—সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রও তুরস্ক থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সরাতে সম্মত হয়।

ইরাক, যুগোস্লাভিয়া ও আধুনিক অবরোধ

১৯৯০ সালে কুয়েত আক্রমণের পর জাতিসংঘ ইরাকের ওপর অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ১৯৯০-এর দশকে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে আড্রিয়াটিক সাগরে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ অভিযান চালানো হয়, যেখানে শত শত জাহাজ আটক বা তল্লাশি করা হয়।

গাজা ও ইয়েমেন: দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের বিতর্ক

২০০৭ সাল থেকে গাজায় কঠোর অবরোধ চলছে, যা অর্থনীতি ও জনজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তবে রাজনৈতিক সমাধান আসেনি। অন্যদিকে, ২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের ওপর নৌ ও আকাশপথে বিধিনিষেধ আরোপ করে, যার ফলে দেশটিতে মানবিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

নৌ-অবরোধের বাস্তবতা

ইতিহাস বলে, নৌ-অবরোধ অনেক সময় সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে সফল হলেও এটি সবসময় স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান দিতে পারে না।

বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকট ও আন্তর্জাতিক বিতর্কের জন্ম দেয়।