গাজায় যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির ভয়াবহতার মধ্যে এবার মৃতদের দাফনের জায়গারও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ইসরাইলি হামলায় হাজারো মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি বহু কবরস্থান ধ্বংস হয়েছে। ফলে নিহত স্বজনদের দাফন করতে গিয়ে পরিবারগুলোকে পুরোনো কবর পুনর্ব্যবহার, অস্থায়ী কবর তৈরি কিংবা ধ্বংসস্তূপের জায়গায় লাশ সমাহিত করার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
২০ বছর বয়সি ওমর আল-সাওহির বাবা মোহাম্মদ আল-সাওহি ছিলেন ৪০ বছর বয়সি। গত ১০ জুন গাজার ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত ইসরাইল নির্ধারিত সামরিক এলাকার কাছে গুলিতে নিহত হন তিনি। গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় একটি ছোট রাস্তার পাশের দোকানে চা-কফি বিক্রি করছিলেন মোহাম্মদ। হঠাৎ গুলি এসে তার ঘাড়ে লাগে এবং ঘটনাস্থলেই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু হয়।
বাবাকে দাফন করতে ওমর জেইতুন কবরস্থানে গেলে দেখতে পান, সেখানে কবরের জন্য প্রায় কোনো জায়গাই অবশিষ্ট নেই। ঘনবসতিপূর্ণ কবরগুলোর অধিকাংশই যুদ্ধের সময় নিহত ফিলিস্তিনিদের। অনেক কবরের কোনো স্থায়ী চিহ্নও নেই। শুধু একটি পাথর কিংবা কাগজে মৃত ব্যক্তির নাম লিখে রাখা হয়েছে।
ওমর বলেন, কবরস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি অসংখ্য কবর দেখতে পান। বালুর স্তূপের নিচে মানুষকে দাফন করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কবরের ওপর শুধু একটি পাথর ও কাগজে শহীদের নাম লেখা রয়েছে; যুদ্ধের আগের মতো কবর তৈরি বা যথাযথভাবে প্রস্তুত করার সুযোগ নেই।
একটি নতুন কবর তৈরি করতে বর্তমানে প্রায় ৫০০ শেকেল বা ১৬৭ ডলার খরচ হয়। ওমরের পরিবারের পক্ষে সেই অর্থ জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। একই সঙ্গে নতুন কবরের জন্য জায়গাও পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তারা মোহাম্মদকে তার দাদার কবরে দাফন করেন।
ধ্বংসস্তূপে দাফন
গাজায় যুদ্ধের কারণে হাসপাতাল, পৌরসেবা ও অন্যান্য নাগরিক সেবা প্রায় ভেঙে পড়েছে। একই সঙ্গে চলমান হামলার ঝুঁকিতে বহু লাশ সময়মতো শনাক্ত বা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। যুদ্ধের বিভিন্ন সময়ে হাজারো নিহত ফিলিস্তিনিকে ‘নিখোঁজ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
অনেক লাশ বাড়ির আঙিনা, তাঁবু, বাস্তুচ্যুতদের শিবির, স্কুল কিংবা হাসপাতালের প্রাঙ্গণে অস্থায়ীভাবে দাফন করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর গাজায় ইসরাইলি হামলার মাত্রা সাময়িকভাবে কমে আসে। এই সুযোগে বহু পরিবার ধ্বংস হওয়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপ কিংবা অস্থায়ী কবর থেকে স্বজনদের লাশ উদ্ধার করে পুনরায় দাফনের উদ্যোগ নেয়।
গাজার কর্তৃপক্ষের হিসাবে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও অন্তত ১ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের জন্য নতুন করে দাফনের জায়গার প্রয়োজন হয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতালগুলোর প্রাঙ্গণে থাকা সাতটি গণকবর থেকে ৫২৯ ফিলিস্তিনির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ধ্বংস হয়েছে ৪০টির বেশি কবরস্থান
গাজায় কবরের সংকটের কারণ শুধু বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু নয়; যুদ্ধের সময় বহু কবরস্থানও ধ্বংস হয়েছে। গাজার ধর্মীয় ও ওয়াক্ফ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস হয়েছে।
ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় কবরস্থানে প্রবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে পরিবারগুলোর জন্য দাফনের জায়গা পাওয়ার সুযোগ আরও সীমিত হয়েছে।
ইসরাইলি বোমাবর্ষণ ও বাস্তুচ্যুতির নির্দেশে লাখো ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ফলে যেসব জায়গা আগে কবরস্থান হিসেবে নির্ধারিত ছিল, সেগুলোর কিছু এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কবরের ফলকসহ প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রীর সংকটও দাফনের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। গাজার কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমানে একটি দাফনের খরচ ৭০০ থেকে ১ হাজার শেকেল বা প্রায় ২৩৫ থেকে ৩৩৫ ডলারের মধ্যে দাঁড়িয়েছে। স্থায়ী কবরের ফলক তৈরি করতে না পেরে অনেকে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনের ইট-পাথর, কাদা কিংবা ঢেউটিন দিয়ে অস্থায়ীভাবে কবর চিহ্নিত করছেন।
৬০ থেকে ৬ হাজার কবর
খান ইউনিস কবরস্থানের কর্মী তাফেশ যুদ্ধের ভয়াবহতার এক নির্মম চিত্র তুলে ধরেছেন। যুদ্ধ শুরুর আগে ওই কবরস্থানে প্রায় ৬০টি কবর ছিল। এখন সেখানে কবরের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। যুদ্ধের একপর্যায়ে তাকে প্রতিদিন প্রায় ৩৫টি কবর প্রস্তুত করতে হয়েছে।
তাফেশ বলেন, এত ভয়াবহ রক্তপাতের সময় তারা আগে কখনো দেখেননি। এমন কোনো দিন যায় না, যেদিন কয়েক ডজন নিহত মানুষকে সেখানে দাফন করতে হয়।
তার কাছে আসা নিহতদের অনেকেই নারী ও শিশু। তাদের মধ্যে নবজাতকও রয়েছে। অনেক সময় ইসরাইলি হামলায় একটি বাড়ি, গাড়ি কিংবা তাঁবু পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেলে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের লাশ একসঙ্গে কবরস্থানে নিয়ে আসা হয়।
তাফেশের ভাষায়, তারা আমাদের মাথার ওপর ঘরবাড়ি ধ্বংস করে, আর সেই ঘরের ধ্বংসস্তূপ থেকেই আমরা আমাদের কবর তৈরি করি।
গাজায় তাই যুদ্ধের ভয়াবহতা শুধু জীবিতদের বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। নিহতদের শেষ আশ্রয়—একটি কবর—পাওয়াও এখন বহু পরিবারের জন্য কঠিন সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

