রবিবার, ৩০ আগষ্ট ২০২৬

শিরোনাম

এক চা-বিরতিই যেভাবে বাঁচিয়ে দিল ৫ বন্ধুর প্রাণ

রবিবার, আগস্ট ৩০, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

একটি সামান্য চা-বিরতি। শুনতে একেবারেই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু নেপালের ভয়াবহ বন্যার দিনে সেই কয়েক মিনিটের বিরতিই হয়ে উঠেছিল পাঁচ বন্ধুর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। চা খেতে না থামলে হয়তো ভয়ংকর স্রোতে ভেসে যেতেন তারাও।

বুধবার (২৬ আগস্ট) ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর উপত্যকায় বন্যা আঘাত হানার সময় তারা ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ১০–১৫ মিনিট আগে রওনা দিলে হয়তো ভেসে যেতে হতো তাদের। তবে প্রাণে বেঁচে গেলেও পরবর্তী দুই দিন তাদের কাটাতে হয়েছে আতঙ্কের মধ্যে। উঁচু একটি জায়গায় আশ্রয় নিয়ে তারা ত্রিশূলী নদীর ভয়ংকর স্রোত দেখেছেন। অবশেষে শনিবার (২৯ আগস্ট) নিরাপদে বাড়ি ফিরেছেন তারা।

বেঁচে ফেরা এই পাঁচ বন্ধুরা হলেন—নারায়ণ সেন, দীনেশ ওঝা, প্রেম সিং জগত, যতীন্দ্র প্রকাশ ও দীনেশ সিং ঠাকুর। তাদের বয়স ৫০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। তারা ভারতের ছত্তিশগড়ের রায়পুরের মানা ক্যাম্প এলাকার বাসিন্দা।

৫৩ বছর বয়সি নারায়ণ সেন একটি সেলুন চালান। তিনি বলেন, ‘২৬ আগস্ট আমরা চায়ের জন্য থেমেছিলাম। ঠিক তখনই আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে। আমরা যদি ১০–১৫ মিনিট আগে রওনা দিতাম, তাহলে হয়তো আটকা পড়ে যেতাম।’

তিনি আরও বলেন, ‘সেখানে না থামলে কী হতো, আমরা নিজেরাও জানি না।’

গত ২১ আগস্ট এই পাঁচ বন্ধু রায়পুর থেকে যাত্রা শুরু করেন এবং পরদিন নেপালে পৌঁছান। সেখানে একটি গাড়ি ভাড়া করে পশুপতিনাথ মন্দির, মনোকামনা মন্দিরসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

২৬ আগস্ট সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার দিকে তারা ধাদিং জেলার মালেখু শহরের একটি হোটেলে চা খেতে থামেন। সেখানেই জানতে পারেন, সামনে থাকা একটি সেতু বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।

হোটেলের মালিক ছিলেন একজন ভারতীয় নাগরিক। তিনি বিপদে পড়া এই পাঁচ বন্ধুকে খাবারসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন।

নারায়ণ সেন বলেন, ‘আমরা দেখেছি গাড়ি ত্রিশূলী নদীর স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। মরদেহসহ নানা জিনিসও পানির সঙ্গে ভেসে যাচ্ছিল। আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম। সবসময় মনে হচ্ছিল পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।’

বন্যার পানি বাড়তে থাকায় তারা মালেখুর একটি উঁচু এলাকায় আশ্রয় নেন। রাত কাটান নিজেদের গাড়িতেই। স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের সদস্যরা তাদের সহযোগিতা করেন।

৫৫ বছর বয়সি দীনেশ সিং ঠাকুর পুলিশের হেড কনস্টেবল। তিনি জানান, বন্যা আঘাত হানার সময় তারা পশুপতিনাথ মন্দির থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে ছিলেন।

তার ভাষায়, ‘হোটেলে চা খাওয়ার সময় হঠাৎ দেখলাম মানুষজন দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছে। পরে জানতে পারি ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক ধ্বংস হয়েছে। পুরো গ্রাম, ভবন, অফিস ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস হয়ে যাওয়ার খবর শুনেছি।’

ত্রিশূলী নদীর তীরে গিয়ে নিজেদের চোখেও পরিস্থিতি দেখেন তারা। ঠাকুর বলেন, ‘আমরা যা দেখেছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।’

তিনি জানান, আতঙ্কের মধ্যে তারা বারবার ভগবান শিবের নাম জপ করেছেন। তাদের বিশ্বাস, শিবের আশীর্বাদই তাদের রক্ষা করেছে।

ঠাকুর স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, সেখানে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা ছিল না। তবে প্রশাসন ও পুলিশ তাদের সহযোগিতা করেছে এবং উঁচু জায়গায় থাকায় আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

ইন্টারনেট চালু থাকায় তারা নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছেন। ভারত সরকারের দেওয়া হেল্পলাইন ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থানও জানিয়েছেন।

অবশেষে ২৮ আগস্ট নেপাল ছাড়েন পাঁচ বন্ধু।

ভয়াবহ এই অভিজ্ঞতার মধ্যেও তাদের জন্য একটি আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল। স্থানীয় নারী নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের হাতে রাখি পরিয়ে দেন।

ঠাকুর বলেন, ‘রাখি উৎসবের পর আমাদের বাড়ি ফেরার কথা ছিল। তাই আমাদের বোনেরা আগে থেকেই রাখি দিয়েছিল। সেখানে দায়িত্ব পালনরত নারী নিরাপত্তাকর্মীরা আমাদের হাতে সেই রাখি পরিয়ে দেন। সেটিই ছিল সবচেয়ে স্বস্তির মুহূর্ত।’

দীনেশ ওঝা একটি টেইলারিংয়ের দোকান চালান। তিনি বলেন, বন্যার পর তারা যে দৃশ্য দেখেছেন, তা সারা জীবন মনে থাকবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা যা দেখেছি, তা কোনোদিন ভুলতে পারব না। অনেক মানুষকে নিজেদের নিখোঁজ স্বজনদের মরিয়া হয়ে খুঁজতে দেখেছি।’

ওঝা আরও বলেন, তারা গাড়িতে ঘুমানোর চেষ্টা করলেও আসলে ঘুমাতে পারেননি।

অবশেষে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা খুব খুশি যে শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরতে পেরেছি।’