সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

শিরোনাম

খামেনির জানাজায় শোকের আবহে যে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বার্তা দিচ্ছে ইরান

সোমবার, জুলাই ৬, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা উপলক্ষে আয়োজিত এক সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানগুলোতে নিজ দেশে এবং পুরো অঞ্চলে নিজেদের রাজনৈতিক বার্তা ও সরকারপন্থি ধর্মীয় প্রচারণা সুচারুভাবে পৌঁছে দিতে ব্যাপক ধর্মীয় প্রতীক ও ভাবমূর্তি ব্যবহার করছে ইরান।

অনুষ্ঠানে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা ইরান সরকারের সমর্থকদের মধ্যে ঐক্যের একটি আখ্যান তৈরি করতে সতর্কতার সঙ্গে সাজানো রাষ্ট্রীয় বয়ান থেকে শুরু করে সুসংগঠিত শোকযাত্রার মতো নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার (৩ জুলাই) থেকে তেহরানে তিন দিনের শোক পালনের মধ্য দিয়ে খামেনির জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরের মধ্য দিয়ে তার শোকযাত্রা প্রদক্ষিণ করবে, যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে প্রয়াত এই সর্বোচ্চ নেতার জীবন এবং সামগ্রিকভাবে শিয়া মতাদর্শের গভীর প্রতীকী বার্তা।

উল্লেখ্য, ১৯৮৯ সাল থেকে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে থাকা খামেনি ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এক বিমান হামলায় নিহত হন। এরপর মার্চ মাসে তার ছেলে মোজতবা খামেনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

ইরানি কর্তৃপক্ষ তাদের আনুষ্ঠানিক বার্তায় খামেনির ‘শাহাদাত’-এর ওপর জোর দিচ্ছে এবং তার মৃত্যুতে শোক পালন করাকে একটি জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরছে।

জানাজার অনুষ্ঠানগুলোর জন্য নির্ধারিত আনুষ্ঠানিক স্লোগান ‘আমাদের জেগে উঠতে হবে’ (উই মাস্ট রাইজ) ইরানের শোকার্ত মানুষের হাতে থাকা ব্যানার ও ফেস্টুনে শোভা পাচ্ছে। তবে আরবি ভাষাভাষী ও আন্তর্জাতিক মহলের জন্য কর্তৃপক্ষ এর আরবি প্রতিশব্দ ‘আল্লাহর জন্য জেগে ওঠো’ (রাইজ ফর গড) বেছে নিয়েছে। দুটি স্লোগানই পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে মুসলমানদের ঐশী উদ্দেশ্যে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

খামেনির মুষ্টিবদ্ধ হাত

লাল ও কালো পটভূমিতে খামেনির প্রতিবাদী মুষ্টিবদ্ধ হাতের একটি চিত্র এই আয়োজনের প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তার মৃত্যুর পর থেকে সরকারি প্রচারণায় এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই প্রতীকের উৎস মূলত মোজতবা খামেনির নামে প্রচারিত একটি খুদে বার্তা। সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর থেকে মোজতবাকে প্রকাশ্যে দেখা বা শোনা যায়নি।

নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি নিহত হওয়ার ঠিক আগে ১২ মার্চ প্রকাশিত ওই খুদে বার্তায় বলা হয়েছিল, মোজতবা ‘শুনেছেন যে, খামেনির সুস্থ হাতের মুঠি শক্ত হয়ে ছিল’।

উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালে এক বোমা হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর ডান হাতের কর্মক্ষমতা হারিয়েছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

মূলত গুপ্তহত্যার ঝুঁকি এড়াতে এবং নিরাপত্তার স্বার্থেই মোজতবা খামেনি তার বাবার জানাজা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতায় অনুপস্থিত থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বলা হচ্ছে, কালো ও লাল রঙের ব্যবহার মূলত শোক, শাহাদাত এবং প্রতিশোধের আহ্বানের সমন্বিত রূপ।

গত রোববার (৫ জুলাই) বিকালে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এক বিবৃতিতে জানায়, ‘নেতার অন্তিম যাত্রায় সঙ্গী হওয়া এই জনসমুদ্র দুটি স্লোগানে ফেটে পড়ছে: শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ইরানের শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধ।’

শনি ও রোববার তেহরানের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় স্থাপনা গ্র্যান্ড মোসাল্লায় খামেনির মরদেহ রাখা হয়। সেখানে ওড়ানো হয়েছে একটি বিশাল লাল পতাকা। পতাকায় আরবিতে লেখা রয়েছে, ‘হে হোসাইনের প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা’। এর মধ্য দিয়ে খামেনির হত্যাকাণ্ডকে প্রতিবেশী ইরাকের কারবালার ঘটনার সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যেখানে ১৩০০ বছর আগে উমাইয়া খলিফা মুয়াবিয়ার বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিলেন মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র। অনেক শিয়া মুসলিমের কাছে ওই রাজবংশ অবৈধ ও নিপীড়ক শাসনের প্রতীক।

এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়াকে একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ ঠিক কীভাবে এই প্রতিশোধ নিতে চায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর, ইরানি সামরিক বাহিনী ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল। যদিও তাতে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। তবে সে সময় তারা জানিয়েছিল, এই অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী বিতাড়নই তাদের প্রতিশোধের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।

শিয়া ইসলামি রাজনীতির মানচিত্র

খামেনির মরদেহ বহনের জন্য যে পথটি বেছে নেওয়া হয়েছে, তারও একটি বিশেষ বার্তা রয়েছে। এটি তেহরানের দক্ষিণে অবস্থিত শিয়াদের পবিত্র শহর কোম থেকে শুরু হয়ে ইরাকের নাজাফ এবং কারবালা (শিয়া ইসলামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান) প্রদক্ষিণ করে মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারে গিয়ে শেষ হবে, যেখানে তাকে সমাহিত করা হবে।

ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনিকে সম্মান জানাতে নির্মিত গ্র্যান্ড মোসাল্লা থেকে এই আনুষ্ঠানিকতা শুরু করাকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির এই দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের একটি প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ধর্মীয় বৈধতা এবং ধর্মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদনের জন্য কোম শহরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই খোমেনির সমর্থনে পাহলভি রাজবংশের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছিল, যা এক বছর পর ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে রূপ নেয়। অন্যদিকে, নাজাফ হলো ইরানের বাইরে শিয়াদের এমন এক পবিত্র স্থান, যার সঙ্গে শিয়াদের ১২ জন ইমামের প্রথম ইমাম, ইমাম আলীর সম্পর্ক রয়েছে।

কারবালা ও মাশহাদ সফরের পর খামেনির মরদেহ মূলত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের আদর্শিক ভিত্তিগুলোর একটি বড় সফর সম্পন্ন করবে, যা গত পাঁচ দশক ধরে বিশ্বজুড়ে শিয়া মতাদর্শ প্রচারের চেষ্টা করে আসছে।

তেহরান-সমর্থিত এই অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠী ও আন্দোলনগুলোকে নিয়ে গঠিত তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স)-ও এই আখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শুক্রবার তেহরানে খামেনিকে সম্মান জানানোর রাষ্ট্রীয় আয়োজনে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস ও ইসলামিক জিহাদ এবং ইয়েমেনের হুতি কর্মকর্তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়।

খামেনির কফিনের সামনে দাঁড়ানো প্রতিটি বিদেশি প্রতিনিধিদলের উদ্দেশে রাষ্ট্র-নিযুক্ত এক আবৃত্তিকার পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত পাঠ করেন। এরপর তারা ইরানি নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।

হামাস, হিজবুল্লাহ এবং পাকিস্তানের (যাকে ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে) জন্য নির্বাচিত আয়াতে চুক্তি, অবিচলতা এবং ঈশ্বরের প্রতি ভক্তির ইতিবাচক বার্তা ছিল।

তবে রিয়াদের (সৌদি আরব) প্রতিনিধিদলের জন্য পঠিত আয়াতটি আরবি ভাষার গণমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। কারণ, ওই আয়াতে সপ্তম শতাব্দীতে মদিনার কাছে বদরের যুদ্ধে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের দুটি শিবিরের মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্যপট তুলে ধরা হয়েছে। আয়াতটির অর্থ হলো: ‘বিশ্বাসীরা তাদের নিজেদের চোখে শত্রুদের দ্বিগুণ দেখেছিল। কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার বিজয় দিয়ে সাহায্য করেন। নিশ্চয়ই এর মধ্যে দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের জন্য শিক্ষা রয়েছে।’ এই আয়াত বেছে নেওয়ার বিষয়টিকে বিশ্লেষকেরা নানাভাবে ব্যাখ্যা করছেন।