বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

শিরোনাম

মিয়ানমারে তরুণদের বন্দুক ধরতে বাধ্য করছে জান্তা বাহিনী, নতুন কৌশলে কোণঠাসা বিদ্রোহীরা

বুধবার, জুন ১০, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

জঙ্গল দিয়ে ঘেরা পাহাড়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিদ্রোহী শিবিরের সেই চার তরুণ কখনোই মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে জড়াতে চাননি। জান্তা বাহিনীর হয়ে বন্দুক ধরার কোনো ইচ্ছাই তাদের ছিল না।

তাদের একজন পেশায় শেফ ছিলেন, কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তা থেকে তাকে তুলে নেওয়া হয়। সঙ্গে পরিচয়পত্র না থাকার অজুহাতে জান্তা সেনারা তাকে আটক করে এবং জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। দ্বিতীয় তরুণকে গভীর রাতে কারাওকে সেশন থেকে ফেরার পথে ধরা হয়। তৃতীয়জন বন বিভাগে কর্মরত অবস্থায় গ্রেফতার হন। আর চতুর্থ তরুণের অভিযোগ— গ্রেফতারের পর তার জুতার ভেতর জোর করে মাদক ঢুকিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে তাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়।

১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সি এই তরুণদের একজন বলেন, কী ঘটছে তা বোঝার আগেই আমাদের সরাসরি সম্মুখ সমরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আরেকজন বলেন, ওরা আমাদের দিয়ে এমন সব কাজ করাত যা আমরা কখনোই করতে চাইতাম না। সকালে, দুপুরে এমনকি রাতেও আমাদের কোনো বিশ্রাম ছিল না। বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগ পাওয়াদের সব খাটনি খাটতে হতো, অথচ নিয়মিত সেনারা কিছুই করত না।

চার মাসের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষে তাদের কারেন রাজ্যের ফ্রন্ট লাইনে পাঠানো হয়। একদিন রাতে গোসল করতে যাওয়ার বাহানায় তারা সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু জান্তা ক্যাম্প থেকে পালালেও পথিমধ্যে তারা পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) একটি বিদ্রোহী টহলের মুখোমুখি হন এবং সেখানে আটক হন। তবে এখানে এসে তারা অনেক বেশি স্বস্তিতে আছেন। তাদের ভাষ্য, এখানে তাদের ‘অচেনা শত্রু নয়, ভাইয়ের মতো’ মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে এই তরুণদের নাম-পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। আপাতত তারা পিডিএফ-এর সঙ্গেই থাকবেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের থাইল্যান্ড সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। কারণ হিসেবে একজন বলেন, এখন বাড়ি ফিরলে জান্তা বাহিনী আমাদের ঠিকই খুঁজে বের করে ফেলবে।

এই চার তরুণের অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাস্তব সত্য হলো—জান্তা সরকারের জোরপূর্বক সামরিক নিয়োগ নীতি মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে সামরিক জান্তার ভাগ্য বদলে দিয়েছে। দেশের অনেক অঞ্চলেই বিদ্রোহীরা এখন জান্তা বাহিনীর তুলনায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ২০২১ সালে অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করা জান্তার বিরুদ্ধে এতদিন যে বিদ্রোহীরা আক্রমণাত্মক অবস্থানে ছিল, তারা এখন মূলত রক্ষণাত্মক নীতি বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

যদিও জান্তা বাহিনী এখনো দেশের অর্ধেকেরও কম অংশ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে, তবে সাম্প্রতিক সময়ে তারা মান্দালয় থেকে মায়িতকিনাগামী গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কসহ বেশ কিছু প্রধান শহর পুনরুদ্ধার করেছে। কাচিন, চিন এবং কারেন রাজ্যের মতো সীমান্ত এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে হাজার হাজার জান্তা সেনা অগ্রসর হচ্ছে।

পিডিএফ-এর ব্যাটালিয়ন কমান্ডার কো কাউং জানান, ২০২৪ সাল থেকে জান্তার জারি করা এই বাধ্যতামূলক সামরিক আইনের কারণেই যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেছে। তিনি বলেন, জান্তার এই জোরপূর্বক সেনা নিয়োগ আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এর ফলে জান্তা বাহিনী সীমাহীন জনবল (ম্যানপাওয়ার) পাচ্ছে।

কো কাউং আরও বলেন, আমাদের প্রযুক্তিগত বা বুদ্ধিবৃত্তিক সুবিধা থাকলেও সম্পদ খুবই সীমিত। তহবিলের অভাবে আমরা ইচ্ছামতো অস্ত্রের যন্ত্রাংশ বা গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে পারছি না, আর জান্তার মতো সহজে নতুন সেনাও নিয়োগ দিতে পারছি না।

ড্রোনের আকাশ ও রাশিয়ার ছায়া

পার্বত্য ক্যাম্পের পিডিএফ কমান্ডার ডা ওয়া-ও স্বীকার করেন যে, অনিচ্ছাকৃতভাবে এলেও জান্তা সেনারা এখন অনেক বেশি সুশৃঙ্খল এবং আদেশ পালনে পারদর্শী হয়ে উঠছে। তিনি জানান, জান্তার রণকৌশল এখন অনেকটাই বদলে গেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি করার পর জান্তা বাহিনীর বিমান শক্তি বহুগুণ বেড়েছে। আগে যেখানে একটি যুদ্ধবিমান আসত, এখন সেখানে জোড়ায় জোড়ায় বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া ড্রোন প্রযুক্তিতেও জান্তা এখন বিদ্রোহীদের চেয়ে সংখ্যা ও মানে এগিয়ে রয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীনের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি। কারেন ও কাচিন রাজ্যে খনিজ সম্পদে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা চীন বেশ কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে জান্তার যুদ্ধবিরতি করিয়ে দিয়েছে, যার ফলে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অস্ত্রের সরবরাহ চেইন অনেকটাই ভেঙে পড়েছে।

জঙ্গলের ভেতরের এক ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্লাটুন কমান্ডার কিয়ার সোয়ে বলেন, সবার লড়াই করার প্রবল ইচ্ছা আছে। কিন্তু আমাদের প্রধান দুর্বলতা হলো অস্ত্র ও গোলাবারুদের তীব্র সংকট। ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে নিজের ডান পায়ের গোড়ালি হারানো কিয়ার সোয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সুস্থ হয়েই তিনি আবার যুদ্ধে ফিরবেন; কারণ পিছটান দেওয়ার কোনো সুযোগ তাঁর সামনে নেই।

যুদ্ধের মধ্যে এক চিলতে আলো

বাঁশ ও কাঠের তৈরি কুঁড়েঘরে সৌরবিদ্যুতের সাহায্যে চলা এই ফিল্ড হাসপাতালটি চালান ডা. সং, যিনি নিজে একসময় ১৯ বছর জান্তার সামরিক একাডেমিতে ছিলেন। তহবিল ও ওষুধের তীব্র সংকটের মধ্যেও তিনি তরুণ যোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছেন।

এই যুদ্ধ আর কান্নাকাটির মধ্যেই হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে জন্ম নিল এক নবজাতক কন্যা শিশু। ২৯ বছর বয়সি মে কিউট মন যখন প্রসব বেদনায় ছটফট করছিলেন, তার ২৪ বছর বয়সি বিদ্রোহী স্বামী ইন চিত তখন পরম মমতায় হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিলেন। মায়ানমারের ঐতিহ্য অনুযায়ী জন্মের সময় বৌদ্ধ মন্ত্র পাঠ করার কথা থাকলেও, উত্তেজনায় শব্দগুলো ভুলে যান ইন চিত। পরে তিনি মোবাইল ফোনে স্পিকারে মন্ত্র বাজিয়ে মেয়ের জন্মকে স্বাগত জানান।

ডা. সং হাসিমুখে শিশুটিকে কোলে তুলে নেন। বাবা-মা মেয়ের নাম রেখেছেন ‘সু পেয়ে’, যার অর্থ ‘পূরণ হওয়া ইচ্ছা’।

মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে জানতে চাইলে ইন চিত মৃদু হেসে বলেন, একটি মুক্ত এবং গণতান্ত্রিক মিয়ানমার। জান্তা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নিজেদের গ্রাম হওয়ায় এখনই বাবা-মার কাছে মেয়েকে নিয়ে যেতে পারছেন না তারা। তবে ইন চিতের বুকভরা আশা, বিপ্লব শেষ হয়ে যখন শান্তিময় সময় ফিরবে, আমরা মেয়েকে নিয়ে পরিবারের সবার সঙ্গে দেখা করতে যাব।