যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে রাজ্য পর্যায়ের কোনো উচ্চ পদে ফিলিস্তিনি-আমেরিকানদের নির্বাচিত হওয়ার সংখ্যা ১০ জনেরও কম। এবার সেই তালিকায় নিজের নাম লেখাতে চলেছেন আবের কাওয়াস। নিউইয়র্ক সিটির কুইন্স বরোর বাসিন্দা এবং ডেমোক্রেটিক সোশলিস্ট এই নারী আগামী ২৩ জুন সিনেট ডিস্ট্রিক্ট-১২ আসনের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই নির্বাচনে তার মূল প্রতিপক্ষ ফিলিপিনো-আমেরিকান অ্যাসেম্বলিম্যান স্টিভেন রাগা।
এই প্রাইমারি বা দলীয় বাছাইপর্বে যিনি জয়ী হবেন, তিনি আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলের মূল প্রার্থী হিসেবে লড়বেন। সেখানে সফল হলে আগামী বছরের জানুয়ারিতে নিউইয়র্কের রাজধানী অলবানিতে সিনেটর হিসেবে তার মেয়াদ শুরু হবে।
স্টিভেন রাগা ২০২৫ সালে মেয়র জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক নির্বাচনী প্রচারণাকে সমর্থন করেছিলেন। তবে গত সপ্তাহে সেই মামদানি নিজেই এই রেসে আবের কাওয়াসকে সমর্থন দিয়েছেন।
কাওয়াস মিডল ইস্ট আই-কে বলেন, মামদানি আন্দোলন বহু তরুণ ও প্রগতিশীল বামপন্থীদের একটি আশার আলো দেখিয়েছিল, যেখানে তারা নিজেদের হতাশা ভুলে মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচার চালিয়েছিলেন। আমরা সেই গতিকে কাজে লাগিয়ে লড়াইটা টিকিয়ে রাখতে চাই।
শৈশবের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা
গত বছর ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে জয়ের আগে জোহরান মামদানিকে অনেকেই ‘আউটসাইডার’ বা বহিরাগত মনে করতেন। তবে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং বিনামূল্যে বাস ভ্রমণের মতো বামপন্থী প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বাজিমাত করেন। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছিল প্রচারণাজুড়ে তার স্পষ্ট ফিলিস্তিনি-পন্থী অবস্থানের কারণে। গাজায় চলমান গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তার বিরুদ্ধে ইহুদি-বিদ্বেষের (অ্যান্টিসেমিটিজম) মিথ্যা অভিযোগ আনা হলেও, তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়—এই ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানই তাকে জয়ী হতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল।
আবের কাওয়াসকে ফিলিস্তিন ইস্যুতে নতুন করে কোনো অবস্থান তৈরি করতে হয়নি। তিনি নিজেই সেই অবস্থানের এক জীবন্ত প্রতীক। তিনি একজন ফিলিস্তিনি অভিবাসী, যিনি নিজের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। তার বিশ্বাস, নতুন এই শহরে নাগরিক অধিকারের লড়াই এবং সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগই মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করতে পারে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের (নাইন-ইলেভেন) সন্ত্রাসী হামলার পর নিউইয়র্কসহ পুরো আমেরিকাজুড়ে মুসলমানদের ওপর তীব্র দমনপীড়ন শুরু হয়। এফবিআইয়ের অভিযান, নিখোঁজ হওয়া এবং মসজিদে গণ-নজরদারির ওই সময়ে কাওয়াসের নথিপত্রহীন বাবাকে মার্কিন অভিবাসন দপ্তর (আইসিই) গ্রেফতার করে। প্রায় তিন বছর ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি রাখার পর তাকে জর্ডানে পুশব্যাক বা ফেরত পাঠানো হয়। কাওয়াসের শৈশবের স্মৃতির একটা বড় অংশ জুড়ে আছে—ডিটেনশন সেন্টারের কাঁচের দেয়ালের ওপাশ থেকে তার কান্নারত মায়ের বাবার সঙ্গে কথা বলার দৃশ্য।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বছরে ১০ লাখ অভিবাসী বিতাড়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করায় আজ কাওয়াসের মতো হাজারো পরিবার একক অভিভাবকের অধীনে বড় হতে বাধ্য হচ্ছে। কাওয়াস বলেন, আমি চাই না এমন পরিস্থিতি আর কারও জীবনে আসুক। একসময় আমরা নাগরিকত্বের অধিকারের জন্য লড়াই করতাম। আর এখন লড়াই করতে হচ্ছে ট্রাম্প আমলের মুসলিম নিষেধাজ্ঞা বা ভিসা বাতিলের মতো বর্ণবাদী নীতির বিরুদ্ধে।
লড়াকু অতীত ও ডানপন্থীদের নিশানা
নিউইয়র্ক সিটির ৮০ লাখ মানুষের এই বৈচিত্র্যময় জনপদে কুইন্স বরো অন্যতম, যার পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করতে চান হিজাবধারী এই ফিলিস্তিনি নারী। তার নির্বাচনি এলাকার মধ্যে অ্যাস্টোরিয়া, লং আইল্যান্ড সিটি এবং সানিউডের মতো এলাকাগুলো রয়েছে।
ইতিমধ্যে মার্কিন ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো কাওয়াসকে নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা শুরু করেছে। তারা কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস এবং ইউএস ক্যাম্পেইন ফর ফিলিস্তিন রাইটস-এর মতো মানবাধিকার সংস্থায় তার অতীতে কাজ করার বিষয়টিকে সামনে আনছে। ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলো এই সংস্থাগুলোকে ‘আমেরিকান মূল্যবোধের পরিপন্থী’ বলে আখ্যা দিয়ে থাকে।
কাওয়াস বলেন, আমি খুব অল্প বয়স থেকেই মসজিদে পারস্পরিক সহযোগিতা, মাদকাসক্তি এবং পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কাজ শুরু করি। এরপর আরব আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশনের মতো সংগঠনে অভিবাসী অধিকার, ভাষা ব্যবহারের সুযোগ ও পুলিশি সংস্কার নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করেছি। এটিই আমার মূল পরিচিতি।
বৈরী পরিবেশ ও পরিবর্তনের হাওয়া
যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম-আমেরিকান এবং তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আক্রমণ গত ১৫ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মুসলিম পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই এই ধরনের টার্গেটেড হামলা ১১ গুণ বেড়েছে। গত মার্চে নিউইয়র্কের সুপরিচিত ফিলিস্তিনি-আমেরিকান অ্যাক্টিভিস্ট নার্দিন কিসওয়ানির বাড়িতে বোমা হামলার পরিকল্পনাকারী এক ব্যক্তি গ্রেফতার হয়। একই মাসে লেকা কর্ডিয়া নামের এক ফিলিস্তিনি আন্দোলনকারী ১ লাখ ডলার বন্ডে মুক্তি পান।
এমন প্রতিকূল পরিবেশেও প্রার্থী হওয়ার পেছনে কাওয়াসের দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, আন্দোলনকারী হিসেবে তারা এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থায় আছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি মনে করেন এই মুহূর্তে আমেরিকার রাজনীতিতে এক বড় ধরনের রূপান্তর বা পরিবর্তন ঘটছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী নিউ জার্সি রাজ্যে মিশরীয়-আমেরিকান সার্জন ডক্টর অ্যাডাম হামাউই ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়ে ওয়াশিংটনের কংগ্রেসের আসন প্রায় নিশ্চিত করেছেন। গত মে মাসে পেনসিলভানিয়ায় প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট ও ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষের কণ্ঠস্বর ক্রিস রাব-ও প্রাইমারিতে জয়ী হয়েছেন।
কাওয়াস দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই এই প্রার্থীদের বিজয়ী করেছে। তিনি বলেন, যখন আপনি ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলেন, তখন মানুষ বোঝে যে আপনি ক্ষমতার মুখে সত্য বলতে ভয় পান না। স্থানীয় রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষ এটাই প্রত্যাশা করে।
আবের কাওয়াস এ পর্যন্ত ক্ষুদ্র অনুদান থেকে প্রায় ৬০ হাজার ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছেন, যা তার প্রতিদ্বন্দ্বী রাগার চেয়ে কম হলেও, তিনি কিন্তু মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এবং কংগ্রেসের একমাত্র ফিলিস্তিনি নারী সদস্য রাশিদা তলাইবের মতো হেভিওয়েট ব্যক্তিত্বদের পূর্ণ সমর্থন পেয়েছেন।

