বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬

শিরোনাম

ইসরাইলি প্রশিক্ষণের জন্য মরদেহ বিক্রি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়

বুধবার, জুন ৩, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

গবেষণা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নয়নের উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করা মানবদেহের কিছু অংশ ইসরাইলি সামরিক চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছে—এমন অভিযোগ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। এ অভিযোগ সামনে আসার পর অনেক দাতার পরিবার ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। খবর আল জাজিরার।

নেভাদার বাসিন্দা মরিয়ম ভলপিন প্রথম বিষয়টি জানতে পারেন এক শিক্ষানবিশ সাংবাদিকের মাধ্যমে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া (ইউএসসি) এবং আরও একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দান করা মরদেহ মার্কিন নৌবাহিনীর সহযোগিতায় পরিচালিত একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে ইসরাইলি চিকিৎসকরাও অংশ নিয়েছিলেন।

এ তথ্য জানার পর মরিয়মের মনে প্রশ্ন জাগে, তার প্রয়াত মায়ের মরদেহও কি একইভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল? ২০২১ সালে মারা যাওয়ার আগে তার মা জ্যানেট ভলপিন নিজের দেহ চিকিৎসা শিক্ষার কাজে ব্যবহারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করেছিলেন।

শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, ২০১৮ সাল থেকে ইউএসসি অন্তত ৮৯টি মরদেহ একটি যৌথ প্রশিক্ষণ প্রকল্পে সরবরাহ করেছে। সংশ্লিষ্ট নথিতে মার্কিন নৌবাহিনী ও ইসরাইলি চিকিৎসকদের অংশগ্রহণের তথ্যও পাওয়া গেছে।

যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা তৈরির প্রশিক্ষণ

একটি চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন এক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের বিবরণ পাওয়া যায়, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের গুরুতর আঘাতের পরিস্থিতি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছিল। প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত মরদেহগুলোকে বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়, যাতে সেগুলো জীবন্ত মানুষের মতো প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতে পারে।

এ জন্য মরদেহে কৃত্রিম তরল সঞ্চালন করা হয় এবং গুলিবিদ্ধ হওয়া, বিস্ফোরণে আহত হওয়া কিংবা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের মতো পরিস্থিতি অনুকরণ করা হয়। প্রশিক্ষণার্থীরা এসব অবস্থায় জরুরি অস্ত্রোপচার ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পদ্ধতির অনুশীলন করেন।

মার্কিন নৌবাহিনীর দাবি, এটি বাস্তবধর্মী চিকিৎসা প্রশিক্ষণের অংশ। তবে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মনে করেন, এমন উন্নত পদ্ধতি সাধারণ চিকিৎসা শিক্ষার তুলনায় অনেক বেশি বিশেষায়িত এবং সীমিত ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়।

মরদেহের উৎস নিয়ে নতুন প্রশ্ন

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, শুধু ইউএসসি নয়, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগো (ইউসিএসডি) থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মরদেহ সরবরাহ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৫ সালের প্রথম ভাগ পর্যন্ত ইউসিএসডি থেকে শতাধিক মরদেহ ইউএসসিতে পাঠানো হয়েছিল।

তবে উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ই সামরিক প্রশিক্ষণের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, এটি চিকিৎসা ও শিক্ষামূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, সামরিক কার্যক্রম নয়।

সম্মতির বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে দাতাদের সম্মতি নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, দেহদান সংক্রান্ত নথিতে কোথাও উল্লেখ ছিল না যে মরদেহ বিদেশি সামরিক কর্মীদের প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হতে পারে।

সমালোচকদের মতে, দাতারা যদি আগে থেকেই এমন ব্যবহারের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতেন, তাহলে অনেকেই হয়তো ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতেন।

ইউএসসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক মোহাম্মদ রাদ বলেন, বিষয়টি কেবল মরদেহ ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষকে পর্যাপ্ত তথ্য দিয়ে সম্মতি নেওয়া হয়েছিল কিনা, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

ক্ষুব্ধ পরিবারগুলো

অনেক পরিবারের সদস্য জানিয়েছেন, তাদের স্বজনেরা মানবকল্যাণ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার স্বার্থে দেহদান করেছিলেন। কিন্তু সামরিক সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মসূচিতে সেই দেহ ব্যবহার করা হবে—এমন ধারণা তাদের ছিল না।

জেনিফার গোমেজ নামের এক নারী বলেন, তার নানি চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নয়নে অবদান রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কোনো সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণের অংশ হওয়ার কথা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।

এ ঘটনার পর দেহদান কর্মসূচির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক সম্ভাব্য দাতাও এখন তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মসূচিতে দাতাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানানো এবং স্পষ্ট সম্মতি নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।