নেপালের রাসুয়া জেলায় তিব্বত সীমান্তের কাছে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় প্রায় ৪০০ তীর্থযাত্রী নিখোঁজ হওয়ার পর আবারও আলোচনায় এসেছে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ১০৮ ভারতীয় রয়েছেন। বন্যায় কৈলাস ও মানস সরোবরগামী গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধার অভিযান চলছে এবং ভারত নেপালকে সহায়তা করছে। দুর্গম পথ, তীব্র ঠান্ডা, কম অক্সিজেন—তবু কেন কৈলাসে ছুটেন তীর্থযাত্রীরা?
কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পর প্রায় দুই দশক যাত্রা বন্ধ ছিল। ১৯৮১ সালে ভারত-চীন চুক্তির পর আবার শুরু হয়। কোভিড মহামারির কারণে বন্ধ থাকার পর ২০২৫ সালে ফের চালু হয়।
হিন্দুদের বিশ্বাস: কৈলাস পর্বতকে ভগবান শিব ও দেবী পার্বতীর আবাসস্থল মনে করা হয়। মানস সরোবরের জলও পবিত্র বলে বিশ্বাস করা হয়। কয়েক হাজার বছরের পুরোনো এই তীর্থযাত্রার উল্লেখ হিন্দু পুরাণ, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ও জৈন ঐতিহ্যে রয়েছে।
ধর্মীয় গুরুত্ব: হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও বন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি অন্যতম পবিত্র তীর্থযাত্রা। তীর্থযাত্রীরা চীনের তিব্বত অঞ্চলের ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার উঁচু কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবর হ্রদে যান।
ভারতীয়রা কোন পথে যান?
ভারতীয় তীর্থযাত্রীরা মূলত তিনটি পথ ব্যবহার করেন—
লিপুলেখ পাস, উত্তরাখণ্ড: দিল্লি থেকে আলমোড়া ও ধারচুলা হয়ে গুঞ্জি এবং প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উঁচু লিপুলেখ পাস পেরিয়ে তিব্বতে যেতে হয়। এ পথ ভারত সরকারের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়।
নাথু লা পাস, সিকিম: দিল্লি থেকে গ্যাংটক হয়ে নাথু লা পাস পেরিয়ে তিব্বতে যাওয়া হয়। এখানে হাঁটার চেয়ে গাড়িতে যাতায়াত বেশি হওয়ায় বয়স্কদের জন্য তুলনামূলক সহজ। তবে পুরো যাত্রায় ২০ দিনের বেশি সময় লাগতে পারে।
কাঠমান্ডু, নেপাল: কাঠমান্ডু থেকে নেপালগঞ্জ বা সিমিকোট হয়ে হিলসা দিয়ে তিব্বতে যাওয়া হয়। বেসরকারি ট্যুর অপারেটররা এই পথ পরিচালনা করে। হেলিকপ্টারের সুবিধাও রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বন্যায় এই পথটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কেন এই যাত্রা এত কঠিন?
কৈলাস-মানস সরোবরের অধিকাংশ পথই ৪ হাজার ৫০০ মিটারের বেশি উচ্চতায়। ফলে অক্সিজেনের মাত্রা কম থাকে। তীর্থযাত্রীদের প্রচণ্ড ঠান্ডা, অনিশ্চিত আবহাওয়া, ভূমিধস ও দুর্গম পথের মুখোমুখি হতে হয়।
সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো কৈলাস পর্বতের চারপাশে প্রায় ৫২ কিলোমিটারের পরিক্রমা বা ‘কোরা’। এ পথে প্রায় ৫ হাজার ৬৩০ মিটার উচ্চতার দোলমা লা পাস অতিক্রম করতে হয়।
কৈলাস-মানস সরোবর যেতে চীনের ভিসা, তিব্বত গ্রুপ ভিসা এবং বিশেষ আঞ্চলিক প্রবেশ অনুমতি প্রয়োজন। স্বাধীনভাবে এই যাত্রা করা যায় না।
প্রয়োজন হয় বৈধ পাসপোর্ট, সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং ৫ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতায় ভ্রমণের উপযোগী শারীরিক সক্ষমতার চিকিৎসা সনদ। উচ্চতাজনিত জরুরি পরিস্থিতি ও চিকিৎসা সরিয়ে নেওয়ার সুবিধাসহ ভ্রমণ বিমা করাও সুপারিশ করা হয়।
আবেদনের নিয়ম
ভারতীয়রা সরকারি ব্যবস্থায় যেতে চাইলে আবেদন খোলা থাকাকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন করতে পারেন। সাধারণত ১৮ থেকে ৭০ বছর বয়সি ও শারীরিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা অংশ নিতে পারেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে, চীনের ভিসা ও প্রয়োজনীয় অনুমতি হাতে পাওয়ার আগে যাত্রা শুরু বা নেপালের মতো ট্রানজিট এলাকায় যাওয়া উচিত নয়। বেসরকারি ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে গেলে সাধারণত ৪৫ থেকে ৬০ দিন আগে পাসপোর্টের কপি ও প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হয়।

