রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

শিরোনাম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তি নিয়ে ইরানে তুমুল বিতর্ক, কে কোন পক্ষে?

রবিবার, জুন ২১, ২০২৬

প্রিন্ট করুন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর নিয়ে ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শিবিরগুলো তীব্র দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন এ শান্তিচুক্তি নিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির আপত্তির কারণে দেশটির কট্টরপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো আরও উৎসাহিত হয়ে উঠেছে। তারা ওয়াশিংটনের কাছে যেকোনো ছাড় দেওয়ার ঘোর বিরোধী।

মনে করা হচ্ছে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা চুক্তির দায়িত্ব অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের হাতে তুলে দিয়েছেন। তবে পেজেশকিয়ান এখন কট্টরপন্থিদের তোপের মুখে আছেন। কট্টরপন্থিদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো মুহূর্তে আবারও যুদ্ধ শুরু হতে পারে।

পাকিস্তান, কাতার ও অন্যান্য দেশের মধ্যস্থতায় পেজেশকিয়ান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে স্বাক্ষরিত এ চুক্তিটিকে ইসরাইলের সমস্ত রাজনৈতিক দলও চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। তারা ইরান এবং লেবাননের হিজবুল্লাহসহ তেহরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষকে’ দুর্বল করতে সামরিক ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে ইরানে অভ্যন্তরীণ যে রাজনৈতিক সংলাপ চলছে এবং বিভিন্ন গোষ্ঠী এটিকে কীভাবে দেখছে, তা তুলে ধরেছেন তেহরানের জনপ্রিয় সাংবাদিক মাজিয়ার মোতামেদি।

খামেনি কী বলেছেন?

গত মার্চ মাসে বাবা আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা বা শোনা যায়নি। তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির বিষয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়ে ১৮ জুন মোজতবা খামেনির নামে প্রচারিত এক সংক্ষিপ্ত লিখিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘নীতিগতভাবে আমার ভিন্ন মত ছিল।’ তবে বিবৃতিতে বলা হয়, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান স্পষ্টভাবে দায়িত্ব গ্রহণের পরই তিনি এর অনুমতি দিয়েছেন।

পেজেশকিয়ান সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি (পেজেশকিয়ান) স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, মার্কিন পক্ষ যদি অতিরিক্ত দাবি আদায় করতে চায়, তবে তারা মাথা নত করবে না।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, আসন্ন সরাসরি আলোচনার মানে এই নয় যে শত্রুর অবস্থান মেনে নেওয়া হবে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, খামেনি এমন একটি শর্তও দিয়েছেন যে, সামরিক কমান্ডারসহ নিরাপত্তা পরিষদের অন্তত তিন-চতুর্থাংশ সদস্যকে এই চুক্তির অনুমোদন দিতে হবে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় সব সদস্যই চুক্তির পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তবে ভোট প্রক্রিয়ার বিস্তারিত এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কর্তৃপক্ষ কী বলছে?

সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল খামেনিকে আশ্বস্ত করে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত ইরানি নেতাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে তারা ইরানি জাতি এবং প্রতিরোধ ফ্রন্টের অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। কাউন্সিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘পূর্ণ অবিশ্বাস’ নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেবে এবং অপর পক্ষ কোনো শর্ত লঙ্ঘন করলে প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা তাদের রয়েছে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়।

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এই চুক্তিকে একটি ‘ঐতিহাসিক দলিল এবং একটি শক্তিশালী ইরানের বার্তা’ বলে অভিহিত করেছেন, যেখানে ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ছায়ায় শান্তি বাস্তবায়িত হবে।’

সামাজিক মাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, এই চুক্তি এমন এক জাতির কণ্ঠস্বরকে প্রতিফলিত করে, যারা কোনো হুমকি বা চাপের কাছে নিজেদের মর্যাদা ও স্বাধীনতা বিকিয়ে দেয়নি।

পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ খামেনির ‘দিকনির্দেশনামূলক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বার্তার’ জন্য তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সমঝোতা স্মারকটি যুদ্ধ থেকে অর্জিত সাফল্যকে আলোচনার টেবিলে সুসংহত করলেও, এটি একটি ‘কঠিন ও আঁকাবাঁকা পথের শুরু’ মাত্র। গালিবাফ নিজেকে ‘যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক কমান্ডার’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং আলোচনার সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন।

কট্টরপন্থিরা কেন প্রতিবাদ করছে?

খামেনির সমর্থকরা বলছেন, ইরানি আলোচকদের অবশ্যই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের জন্য চাপ দেওয়া অব্যাহত রাখতে হবে এবং চুক্তিতে এই বিষয়টি না থাকলে আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।

যুদ্ধের সময় ইরানের শহরগুলোতে প্রতি রাতে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্র-সমর্থিত সমাবেশগুলোতে পেজেশকিয়ান, গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির কড়া সমালোচনা করতে দেখা গেছে। এই ব্যক্তিদের মধ্যপন্থি শিবিরের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং কট্টরপন্থিদের মতে, তারাই যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দেওয়ার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রাখেন।

কিছু কট্টরপন্থি সংসদ সদস্য দাবি করেছেন যে, যুদ্ধের শুরু থেকে হাতেগোনা কয়েকটি সরাসরি বৈঠক ছাড়া বন্ধ থাকা পার্লামেন্ট পুরোপুরি খুলে দেওয়া হোক। যাতে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিতে বাধা দিতে পারে, যা ইরানের স্বার্থের পরিপন্থি। অতি-রক্ষণশীল শহর কোমের প্রতিনিধি মোহাম্মদ মান্নান রাইসি এক্সে লিখেছেন, সুষ্ঠু বিচার করুন এবং পার্লামেন্ট খুলে দিন, আমার সর্বোচ্চ নেতা একা হয়ে পড়েছেন।

উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র শিয়া শহর মাশহাদে প্রভাবশালী জুমার নামাজের ইমাম এবং সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ আহমাদ আলামলহোদা বলেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আমাদের লড়াই শেষ হয়নি।

শনিবার সকালে, ইরানে কর্মসপ্তাহের প্রথম দিনে, সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পাতায় খামেনির বার্তা এবং সমঝোতা স্মারকের বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছে। কিছু রক্ষণশীল দৈনিক বলেছে যে, সর্বোচ্চ নেতা শর্তসাপেক্ষে চুক্তির অনুমতি দিয়েছেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি স্থাপনের পথে এখনো অনেক কঠিন পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। অন্যদিকে সংস্কারপন্থি সংবাদপত্র ‘এতেমাদ’ এই সমঝোতা স্মারকটিকে একটি বিজয়ের দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।