বিশ্বে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে ‘নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, সেটিই আজ বিশৃঙ্খলা, সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে বলে দাবি করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। মার্কিন প্রশাসনের একের পর এক বৈদেশিক হস্তক্ষেপ এবং মিত্রদের প্রতি দোদুল্যমান নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ‘নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা’র ধারণা তুলে ধরেন, যা বৈশ্বিক রাজনীতিতে আমেরিকাকে একক নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইউক্রেন, সোমালিয়া, চেচনিয়া ও কসোভোর মতো অঞ্চলে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বারবার বৈপরীত্য দেখা গেছে। গণতন্ত্রের বুলি আওড়ালেও বাস্তবে তারা বহুবার স্বৈরতান্ত্রিক সরকারকে সমর্থন করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্বসূরিদের নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও, তার শাসনামলে মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক দেশে বোমাবর্ষণ এবং বিতর্কিত ‘আব্রাহাম চুক্তি’ বাস্তবায়নের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ফিলিস্তিনকে উপেক্ষা করে করা এই চুক্তির ফলে গাজায় আজ ভয়াবহ মানবিক সংকট চলছে।
এছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন ভূমিকাও সমালোচনার মুখে। ইউরোপের দেশগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের বক্তব্য ইউরোপ-আমেরিকা সম্পর্কে নতুন উত্তেজনার জন্ম দেয়।
ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি, ইউরোপের প্রতি অবজ্ঞা এবং নিজস্ব স্বার্থে চালানো নীতিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র আজ নিজেরই প্রতিষ্ঠিত ‘নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা’র ফাঁদে আটকে পড়েছে। মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও দেখা দিচ্ছে অস্থিরতা—বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তহবিল ছাঁটাই, গবেষণা খাতে অবহেলা এবং নৈতিক বিচ্যুতির কারণে রাষ্ট্রযন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যতই বিশ্বে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, ততই বিশৃঙ্খলা ছড়াচ্ছে। এতে করে ‘নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা’র ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। অনেকেই বলছেন, এটি এখন কেবল সময়ের ব্যাপার—এই ব্যবস্থার পতন অনিবার্য।

