শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

শিরোনাম

ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’ বাংলাদেশিদের ওপর যে প্রভাব ফেলছে

শুক্রবার, জুলাই ৪, ২০২৫

প্রিন্ট করুন

যুক্তরাষ্ট্রে পাস হওয়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর ও অভিবাসন সংশোধনী বিল ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’ ঘিরে বিশ্বজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিলটি বাস্তবায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের ওপর উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

এই বিলটি কর, অভিবাসন, সামাজিক সুরক্ষা ও রেমিট্যান্স ব্যবস্থার বড় ধরনের সংস্কার আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে বেশ কিছু প্রস্তাব বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

রেমিট্যান্সে কর, বাড়ছে পাঠানোর খরচ

বিলের অন্যতম বিতর্কিত প্রস্তাব হচ্ছে বিদেশে টাকা পাঠানোর ওপর ১ শতাংশ হারে কর আরোপ। এর ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রতিবার টাকা পাঠানোর সময় অতিরিক্ত খরচে পড়বেন।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স আসে। এই প্রস্তাবিত কর কার্যকর হলে বছরে প্রায় ৪২ মিলিয়ন ডলার কর হিসেবে কেটে রাখা হতে পারে। যা বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রেমিট্যান্সে এমন কর আরোপ করলে অনেক প্রবাসী তাদের রেমিট্যান্স কমিয়ে দিতে বাধ্য হবেন বা বিকল্প, অনানুষ্ঠানিক পথে টাকা পাঠাতে পারেন—যা বৈধ চ্যানেলের জন্য হুমকিস্বরূপ।

স্বাস্থ্যসেবা সীমিত, সংকটে নিম্নআয়ের পরিবার

বিলটির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাবিষয়ক বাজেট কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। এতে করে কম আয়ের বাংলাদেশি অভিবাসীরা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

বর্তমান সময়ে যারা চিকিৎসা খরচ বহনে অক্ষম, তারা ‘মেডিকেইড’ বা খাদ্য সহায়তার মতো কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল। বাজেট কাটছাঁটের ফলে এসব সেবা সীমিত হয়ে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্কদের ওপর সবচেয়ে বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন বিষয়ক আইনজীবী সামিরা হক বলেন, বিলটি বাস্তবায়িত হলে হাজার হাজার বাংলাদেশি পরিবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে। বিশেষ করে, যারা সামাজিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া হচ্ছে জটিলতর, বাড়ছে ব্যয়-বাধা

বিলে অভিবাসন সংক্রান্ত আবেদনপত্র জমা দেওয়ার খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে পরিবার পুনর্মিলন, নাগরিকত্ব লাভ, শরণার্থী আবেদন বা অস্থায়ী বসবাস অনুমতির জন্য আবেদন করা অনেকের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

এছাড়া, আগে যেসব দরিদ্র মানুষ ফি মওকুফের সুযোগ পেতেন, সেটিও বাতিলের কথা বলা হয়েছে। ফলে কম আয়ের বাংলাদেশিদের জন্য বৈধ অভিবাসনের পথ কঠিন হয়ে যাবে।

শিক্ষা ও খাদ্য সহায়তায় কাটছাঁট, বাড়ছে বৈষম্য

বিলটিতে নিম্নআয়ের পরিবারের শিশুদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থা ও বিনামূল্যে খাবার কর্মসূচির বাজেট হ্রাসের কথা বলা হয়েছে। এতে করে যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি প্রজন্মের শিক্ষা ও পুষ্টি সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে। শিক্ষাব্যবস্থায় সমতা কমে যাবে, এবং দরিদ্র পরিবারগুলোর সন্তানেরা পিছিয়ে পড়বে।

এই বিলের মাধ্যমে উচ্চবিত্ত ও কর্পোরেট গোষ্ঠী কর ছাড় পাবে, আর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর পড়বে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ। বাংলাদেশি অভিবাসীদের একটা বড় অংশ শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের হওয়ায়, এই বৈষম্যের প্রভাব সরাসরি তাদের ওপর পড়বে।

প্রবাসীদের উদ্বেগ

নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাসসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা এই বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেছেন। অনেকে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছেন এবং কমিউনিটি সংগঠনের মাধ্যমে কংগ্রেস সদস্যদের কাছে বিলের বিরোধিতা করছেন।

প্রবাসীদের দাবি, এমন বিল পাস হলে সমাজে বৈষম্য বাড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বহুসাংস্কৃতিক নীতির বিপরীতে যাবে।