কাশ্মীরের এক ঈদের সকাল। চারপাশে উৎসবের আবহ, কিন্তু বুদগামের মাসরত মুখতারের ঘরে তখন এক ভিন্ন আবেগ। দুই মাস আগে বাবার জন্মদিনে পাওয়া সোনার দুলটি হাতে নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন। স্মৃতি, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ—সবকিছু যেন একসঙ্গে ভিড় করে তার মনে। শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নেন, সেই মূল্যবান দুলসহ নিজের কিছু সঞ্চয় তিনি দান করবেন ইরানের যুদ্ধবিধ্বস্ত সাধারণ মানুষের জন্য।
মাসরতের মতোই ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বহু মানুষ সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তিগত সম্পদ দান করছেন ইরানের মানুষের সহায়তায়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাতের প্রভাবে তৈরি হওয়া সংকটে ইরানের সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে তারা এগিয়ে আসছেন নিজের সাধ্যের সবটুকু নিয়ে।
কারও দান শুধু টাকা বা সোনা নয়—কেউ দিচ্ছেন ঘরের তামার বাসন, কেউ গবাদিপশু, কেউ আবার জীবিকার একমাত্র বাহন সাইকেল, মিনি ট্রাক বা স্কুটার। শিশুদেরও দেখা গেছে, তাদের বছরের পর বছর জমানো ব্যাংক ভেঙে সাহায্য করতে। দোকানদার ও ব্যবসায়ীরাও প্রতিদিনের আয়ের একটি অংশ আলাদা করে রাখছেন এই মানবিক উদ্যোগের জন্য।
শ্রীনগরের জাদিবাল এলাকার ৭৩ বছর বয়সি তাহেরা জান বলেন, যে তামার বাসন সাধারণত মেয়ের বিয়ের জন্য সযত্নে রাখা হয়, এবার তা চলে যাচ্ছে সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সহায়তায়। অনেক জায়গায় মানুষ নিজেদের দোকান আগেভাগেই বন্ধ করে দিচ্ছেন, যেন দান কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন।
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতারাও এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন। বুদগামের এক বিধায়ক তার এক মাসের বেতন দান করেছেন। শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি হলেও সুন্নি পরিবারেরাও সমানভাবে এগিয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাশ্মীর ও ইরানের মধ্যে শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কই এই আবেগের মূল ভিত্তি। ১৪শ শতকে ইরানি সুফি সাধক মীর সৈয়দ আলী হামাদানির আগমনের পর থেকেই এই অঞ্চলে গড়ে ওঠে গভীর সাংস্কৃতিক বন্ধন। ঐতিহাসিকভাবে তাই কাশ্মীরকে অনেকেই ‘লিটল ইরান’ বলেও অভিহিত করেন।
স্থানীয় প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, কাশ্মীর থেকে ইরানের জন্য সংগ্রহ করা দানের পরিমাণ প্রায় ৬০০ কোটি রুপি, যার মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ, সোনা, গহনা, পশু ও বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী। শ্রীনগর, বুদগাম ও বারামুলাসহ বিভিন্ন এলাকায় স্বেচ্ছাসেবীরা এসব দান সংগ্রহ ও নথিভুক্ত করছেন।
ইরানের নয়াদিল্লি দূতাবাস প্রথমে সামাজিক মাধ্যমে কাশ্মীরিদের এই মানবিক উদ্যোগের জন্য কৃতজ্ঞতা জানালেও পরে সেই পোস্ট সরিয়ে নেয়। পরে আবারও তারা ভারতের ও কাশ্মীরের জনগণকে ধন্যবাদ জানায়।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, অনিয়ন্ত্রিতভাবে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ হয়তো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে। যদিও আয়োজকদের দাবি, এটি সম্পূর্ণ মানবিক সহায়তা কার্যক্রম, যার একমাত্র উদ্দেশ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
সব মিলিয়ে, এই দান শুধু অর্থ বা সম্পদের হিসাব নয়—এটি কাশ্মীরের মানুষের আবেগ, ইতিহাস ও ইরানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক বন্ধনের এক প্রতিচ্ছবি।

