ইসরাইল ও ওয়াশিংটনের ইরান আক্রমণের পর বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারের চরম অস্থিরতার মধ্যেই নিজের স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে উপদেষ্টাদের সমালোচনা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লাস ভেগাসে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন, বিশেষজ্ঞরা তেলের দাম নিয়ে যে হাহাকার করেছিলেন, তা আসলে ভিত্তিহীন।
পরামর্শকদের বাচনভঙ্গি নকল করে ট্রাম্প উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমাদের অনেক উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিভাবান কনসালট্যান্ট আছেন। তারা কাঁপতে কাঁপতে আমাকে বলেছিলেন—স্যার, আপনি যদি ইরানে বোমা ফেলেন, তবে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৩০০ ডলারে গিয়ে ঠেকবে। আমি তাদের মুখের ওপর বলেছিলাম, আমি তেমনটা মনে করি না। কারণ আমরা সব সময় একটা বিকল্প পথ খুঁজে বের করি।’
ট্রাম্প আরও যোগ করেন, ‘তারা আমাকে সাবধান করেছিলেন যে ৩০০ ডলার ব্যারেল মানেই বিশ্বজুড়ে ১৯৩০-এর দশকের মতো মহামন্দা ফিরে আসবে। কিন্তু বাস্তবে কী হলো? কিছুই হয়নি। কারণ আমাদের স্টক মার্কেট এই মুহূর্তে সর্বকালীন রেকর্ড উচ্চতায় অবস্থান করছে। অর্থনীতির চাকা থামেনি।’
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ উত্তেজনা ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে গত মার্চ মাসে তেলের দাম রেকর্ড ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ছিল এক অশনিসংকেত। তবে সম্প্রতি ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতির খবরে বিশ্ববাজারে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
আজ শুক্রবার এশীয় বাজারে লেনদেন শুরু হতেই আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেল প্রতি ৯৮ দশমিক ০৫ ডলারে নেমে এসেছে। একইভাবে মার্কিন তেলের (ডব্লিউটিআই) দামও ৯৪ ডলারের নিচে নেমেছে।
উল্লেখ্য, যুদ্ধের ডামাডোলে তেলের দাম অনেক দিন ১০০ ডলারের ওপরে থাকলেও এই প্রথম তা ৯০ ডলারের ঘরে স্থিতিশীল হওয়ার আভাস দিচ্ছে। এ ছাড়া চলতি সপ্তাহে পাকিস্তানে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি সম্ভাব্য বৈঠকের খবরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনের আশাবাদ এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য আলোচনার খবরে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও এশীয় বাজারে এর চিত্র ভিন্ন। এশীয় বিনিয়োগকারীরা এখনো মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিয়ে সন্দিহান।
আজ সকালে টোকিও স্টকের প্রধান সূচক নিক্কেই ১ শতাংশ কমে লেনদেন শেষ করেছে। হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক ০.৬৯ শতাংশ নিচে অবস্থান করছে। এ ছাড়া সিউলের কোস্পি সূচক ০.৪৬ শতাংশ এবং তাইওয়ানের প্রধান সূচক ০.৮০ শতাংশ পড়ে গেছে। আর চীনের বাজারেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সাবধানী ভাব লক্ষ্য করা গেছে, যা সূচককে ০.২৩ শতাংশ নিচে নামিয়ে দিয়েছে।
তেলের দাম সাময়িকভাবে কমলেও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা। বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি—যা বিশ্ব জ্বালানি ও সার সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ—সেখানে যদি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা বৈশ্বিক খাদ্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।
সার ও জ্বালানি রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার ফলে শস্য উৎপাদন কমে যাবে এবং পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে খাদ্যের দাম আকাশচুম্বী হবে। এই পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে বিশ্বের স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর, যা কোটি কোটি মানুষকে দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

