মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের স্পষ্ট সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে জড়ান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সতর্কবার্তায় তারা ট্রাম্পকে বলেছিলেন, এই সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি করতে পারে এবং ইরানে আরও কট্টরপন্থি নেতৃত্বের উত্থান ঘটাতে পারে। এরপরও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কথায় শেষ পর্যন্ত অভিযান শুরু করেন ট্রাম্প।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশেষ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা আনাদোলু।
যুদ্ধ শুরুর আগে অনুষ্ঠিত বৈঠক সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধে জড়ানোর মাত্র কয়েক দিন আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প ওভাল অফিসে গোয়েন্দাপ্রধানকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, পূর্ণমাত্রার হামলা চালানো ঠিক হবে কিনা, তা জেনে নেওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক (ডিএনআই) তুলসি গ্যাবার্ড সে সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নের একটি চিত্র তুলে ধরেন। ওই বৈঠকের বিষয়ে অবগত সূত্রে জানা গেছে, তিনি ট্রাম্পকে বলেছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হলে সেখানে আরও কঠোরপন্থি এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে ইচ্ছুক একটি নতুন শাসনব্যবস্থা ক্ষমতায় আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, জবাবে তেহরান দ্রুত হরমুজ প্রণালির চলাচল বন্ধ করে দেবে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলবে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনী ও তাদের অংশীদারদের ওপর ইরান হামলা চালাবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ও বিশ্বস্ততা নিয়ে মিত্রদের মনে প্রশ্ন তুলবে।
তবে প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ এক সহকারী ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাকে জানিয়েছিলেন, ইরান কয়েক দশকের মধ্যে এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার এবং একজন ‘শান্তিদূত’ হিসেবে নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি সুসংহত করার এক বিরল সুযোগ।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও আরও সতর্ক এবং আলোচনাভিত্তিক পদ্ধতির পক্ষে ছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, কূটনৈতিক সমঝোতা এমন একটি যুদ্ধের তুলনায় কম ব্যয়বহুল হবে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো পরিণতি হতে পারে।
অন্যদিকে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে ‘নির্ণায়ক’ হামলার বিভিন্ন বিকল্প সম্পর্কে অবহিত করেন। তবে অন্য কর্মকর্তারা গোলাবারুদের ঘাটতি এবং ‘অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকা বাহিনী’কে ঘিরে ঝুঁকির বিষয়ে উদ্বেগ জানান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প এসব উদ্বেগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, সমস্যা দেখা দিলে সামরিক বাহিনী সেগুলো ‘সামলে নিতে পারবে’।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্প প্রথমদিকে সন্তুষ্ট ছিলেন। তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার খবর মার-এ-লাগোর একটি তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে ‘গর্বভরে বুক ফুলিয়ে’ কথা বলেছিলেন।
তবে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া এবং যুদ্ধ অচলাবস্থায় পড়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব ও কাতারের নেতারা হোয়াইট হাউসের ওপর কূটনৈতিক সমাধানের জন্য চাপ দেন। অভ্যন্তরীণ জনমত জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৮০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক যুদ্ধ শেষ করার একটি চুক্তির পক্ষে ছিলেন। এর পর জুনের অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেন ট্রাম্প। কয়েকজন রিপাবলিকানও ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাদের সম্ভাবনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা ১৭ আগস্ট কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। এরপর ট্রাম্প প্রশাসন আবার ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর দিকে ফিরেছে। এই অভিযানের লক্ষ্য হলো দীর্ঘমেয়াদি নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরান সরকারকে দুর্বল করা।

