যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন যে, ইরানের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি খুব শিগগিরই সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। তবে কূটনৈতিক অঙ্গনের বাস্তব পরিস্থিতি এবং ট্রাম্পের বক্তব্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পরিসংখ্যান ও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প অন্তত ৩৭ বার প্রকাশ্যে দাবি করেছেন যে, চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে অথবা ইরান সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী।
হোয়াইট হাউসের সংবাদ সম্মেলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্ট এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে বিভিন্ন আলাপচারিতায় ট্রাম্প একাধিকবার এমন বক্তব্য দিয়েছেন। গত ২৩ মার্চ তিনি এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের বলেন, শান্তি আলোচনার অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুপক্ষের মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। তবে ওই সময় ইরান এমন কোনো আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করে।
এরপর ২৫ ও ২৬ মার্চ ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান চুক্তি করতে অত্যন্ত আগ্রহী। একই সময় এক ক্যাবিনেট বৈঠকেও তিনি বলেন, তেহরান আলোচনায় অগ্রসর হতে চাইছে। ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার সময় তিনি সামাজিকমাধ্যমে লেখেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি চুক্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
১৭ এপ্রিল বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরান প্রায় সব শর্ত মেনে নিয়েছে এবং এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই চুক্তি হতে পারে। পরে ২৩ মে তিনি আবারও দাবি করেন, চুক্তির মূল বিষয়গুলো চূড়ান্ত হয়ে গেছে, কেবল আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বাকি।
দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় এক নির্বাচনি সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, দুই সপ্তাহের মধ্যেই একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য অর্জিত হবে এবং ইরান যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিতে প্রস্তুত।
সর্বশেষ দাবি: ‘দুই বা তিন দিনের মধ্যে চুক্তি’
গত মঙ্গলবার এনবিএ ফাইনাল উপভোগের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প আবারও বলেন, আগামী দুই বা তিন দিনের মধ্যেই ইরানের সঙ্গে সংঘাত নিরসনে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে।
তার দাবি অনুযায়ী, সম্ভাব্য এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান ভবিষ্যতে কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ পাবে না। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, তার মধ্যস্থতার ফলেই সাম্প্রতিক বিমান হামলার পর ইরান ও ইসরাইল সাময়িকভাবে হামলা বন্ধে সম্মত হয়েছে।
দাবি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান
ট্রাম্পের আশাবাদী বক্তব্যের বিপরীতে মাঠের পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও চাপ অব্যাহত রয়েছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনাও পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
ইরান ইতোমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত থাকলে তারা পুনরায় প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। অন্যদিকে, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধবিরতিকেও অনেক পর্যবেক্ষক নাজুক ও অস্থায়ী বলে মনে করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ধারাবাহিক আশাবাদী বক্তব্যের একটি উদ্দেশ্য হতে পারে আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা বজায় রাখা এবং নিজের কূটনৈতিক সক্ষমতার বার্তা দেওয়া। তবে দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের আশ্বাস সত্ত্বেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এসব বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ফলে ইরানের সঙ্গে চুক্তি ‘অতি সন্নিকটে’— ট্রাম্পের এমন পুনরাবৃত্ত দাবিগুলোকে এখন অনেক পর্যবেক্ষক সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করছেন।

